ফুলটুসি

  • 31 May, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 21 view(s)
  • লিখেছেন : মৌসুমী দাস
মেয়েটার স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়া। পুজোয় ভালো জামা বা চুড়িদার নিলে সেটাও যত্ন করে তুলে রাখত—বিয়ের পর কত জামাকাপড় লাগবে, তখন পরব, উঠোন জুড়ে বাসন ধুয়ে একটা একটা করে আবার শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে সব তুলে রাখত, কাজ হয়ে গেলে হাতে সরিষার তেল চেয়ে পায়ে-হাতে বুলিয়ে নিয়ে খানিক বসে গল্প করে বাড়ি যেত।

 সরিতা, হ্যাঁ, আজ একটি মেয়ে সরিতা তার চোখে দেখা একটা প্রাণোজ্জ্বল ছোট্ট মেয়ের যুবতী হয়ে ওঠার কথা শোনাবো, কিছুটা ভাবুক হৃদয় সবিতার, স্কুলের বেঞ্চে বসে যে পড়ার বইয়ের তলায় গল্পের বই রাখতো, ছোট ছোট লেখার ছন্দ মেলাতো… যেটা তার চোখে কবিতা হয়ে যেতো, সংখ্যা গুনে গুনে কবিতার লাইন তৈরি করতো, যখন যে ছন্দ মনের খাতায় ভেসে উঠতো সেটা ডাইরির পাতায় লেখা তার নিত্য দিনের একটা কর্ম ছিলো, দিনের থেকে সে রাত্রি জেগে পড়া তৈরী করতো, কারণ পড়ার ঘর, শোবার ঘর ও খাবার ঘর ছিল একটাই, সে যেমন খুব হৈ-হুল্লোরে ছিলো না, তেমনি হৈ চৈ এর মধ্যে পড়তে পারতো না, রাত্রি জেগে পড়ার ফাঁকে সেখানেও স্থান পেতো গল্পের বই, তবে পড়াশুনাতে খুব একটা ভালো না হলেও পাশ সে করে গেছে। রেজাল্ট বেরানোর সময় কোনদিন নিজের রেজাল্ট দেখার সাহস ছিল না। স্কুল গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা চিন্তিত মুখ নিয়ে মানুষটি তার প্রিয় বাবা তার হাতে দিয়েই বাড়ির দিকে রওনা দিতো, স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজ, সেখানেও এর বিপরীত হয়নি। পরীক্ষার দিন পাড়ার লোক‌ও জানতে পারতো আজ সরিতার পরীক্ষা আছে বাবা আর মেয়ের বইয়ের পড়ার লড়াই রাতে ঘুমে চোখ বুজে আসছে -ওই রাতেই বাবা নিয়ে চললো, “চল্”, বাড়ির সামনে গলির মধ্যে ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে, আর কানের কাছে পড়ার রিহার্সাল।

 ওই সব দিনের কথা ভাবলেই চোখ ভিজে আসে সরিতার। আজ তার সেই প্রিয় লোকটি, তার বাবা এই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছে, না ফেরার দেশে। সরিতা যখন বিয়ে করে তার পরিচিত জায়গা ছেড়ে চেনা আপনজন প্রিয় লোকগুলিকে ছেড়ে এক অচেনা পরিবেশে নতুন এক জীবন সঙ্গীর হাত ধরে চলে আসছিলো, তখন দেখেছিল সেই প্রিয় মানুষটি তার বাবার দুচোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়া, তখন তার ভিতর হাহাকার করে উঠেছিলো।

 সেই সরিতা এখন ঘর সংসারী, অবসরের কোন সময় নেই, বিয়ের প্রথম প্রথম কিছুতেই এই অপরিচিত পরিবেশের সাথে মানাতে পারত না। সব যেন থেকেও শূন্য মনে হতো। সেই নতুন পরিবেশে এসেই সরিতার আবিষ্কার সেই একটি ছট্ ফটে প্রাণোজ্বল মেয়ে যার নাম দিয়েছিল তার শাশুড়িমা ফুলটুসি। আজ তো তার মায়ের সাথে সরিতাদের বাড়ি বাসন মাজা, ঘর-দর পরিষ্কার করা, এক কথায় কাজ করতো। সেই ফুলটুসি আসতো তার মায়ের সাথে কাজ করতে, বিয়ে করে  ফুলটুসির মা তার মায়ের বাড়িতেই স্বামীর সাথে থাকতো। কিন্তু সুখ তার ভাগ্যে ছিল না, জুটে ছিল মাতাল স্বামী, রোজগার পাতির নাম ছিল না, হঠাৎ কয়েক বছর পর স্বামী হয়ে যায় নিরুদ্দেশ। যেন সে শান্তি পেয়েছিল, রোজ মাতাল হয়ে ঘরে ফেরা, শারীরিক অত্যাচার - গালমন্দ…… যা হয় তাদের ঘরে। 

 তারপর কেটে গেছে বেশ কতকগুলি বছর…., সরিতার কোল জুড়ে সুন্দর ফুটফুটে এসেছে একটা পুত্র সন্তান, ফুলটুসি কাজে আসলেই বলতো মাসি ভাইকে দাও না একটু কোলে, শাশুড়ি বলতো সাতবাড়ি কাজ করে এসেছে, ছেলেকে খালি গা করে দাও, দিয়ে কোলে নেয় যেন, তাই করতো সরিতা।

শেষে এমন হল, ফুলটুসি আসলেই ছোট্টবাবু কোলে যাবার জন্য হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যেত। শাশুড়ি বলত, বৌমা, তোমার ছেলে কালোমেয়েকে পছন্দ করে। দেখো, বাড়িতে কেউ আসলে কোলে নিতে গেলে যায় না, কিন্তু ওর কোলে হাসতে হাসতে চলে যায়।

এইভাবে ফুলটুসির ভালোই চলছিলো। দেখতে দেখতে একটু বড়ো হয়েছে। এখন ওর মা অন্য বাড়ির কাজ করে। ফুলটুসি সরিতাদের বাড়ির কাজ করে দেয়। সবাই বলে, খেপি আধঘন্টার কাজ করতে এসে এক ঘন্টা কাটিয়ে দেয়। নানা গল্প করে। কার বাড়ি কি হয়েছে, কার বিয়ে হলো, কে প্রেম করে পালালো। আমাদের বাড়ির থেকে নতুন পুরোনো জামা চুড়িদার অনেক দেওয়া হতো। বলতো, আমি সব পরব না, ভালো করে রেখে দেব। বাবা! বিয়ের পর বর যদি আমাকে কিছু না দিতে পারে, তখন এগুলো কাজে লাগবে। তার ছিল মাইনে পেলেই লটারি টিকিট কাটা। কত বলতাম, কাটিস না। বলতো, মামি, আজ একশো টাকার কিনে দুশো টাকা পেয়েছি গো। কোনোবার বলতো, এবার লস হয়ে গেলো। ওর বাড়িতে ওর মামাতো বোন, ও দিদির এক মেয়ে থাকতো, ছোটো একটা ব্যাগ থাকতো ওর সাথে। যত সাজের জিনিস ভরে সাথে করে নিয়ে ঘুরতো। বলতো, বাড়িতে নিয়ে সব ব্যবহার করবে। ওর শাড়ি-জামা বাড়িতে একটা টিনের বাক্সে তালা দিয়ে রাখতো, চাবিটাও থাকতো তার হাতের ওই ব্যাগটাতে। একদিন এসে বলল, "মামি, আমি আর আসব না পরের মাস থেকে"। বললাম, "কেন রে?” বলল, "কলকাতা যাবো। একজন একটা কাজ দেখে দিয়েছে। মাইনে দেবে ভালো। বাড়িতে চারজন লোক, তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক মহিলা আছে, তার দেখাশোনা করা আর বাড়ির অল্প-সল্প কাজ করতে হবে"। আমাদের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। বললাম, বুঝে-সুজে থাকবি, বাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখবি, পরের মাস থেকে ফুলটুসি কলকাতা চলে যায়। আর ওর মা আগের মতো কাজ করতে আসলো সরিতাদের বাড়ি। সরিতা ফুলটুসির কথা ওর মাকে কেমন আছে না আছে জানতে বলতো। আস্তে আস্তে বেশ কয়েক মাস হয়ে বছর ঘুরে গেলো। ফুলটুসির মাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, হ্যাঁ, খুব ভালো আছে, মাঝে মাঝে টাকা পাঠায় বাড়িতে। এবার আসবে বলেছে ছুটি নিয়ে। বাড়িতে বুড়িমা বয়স্ক একজন আছে, তাকে দেখার কেউ নেই বলে আসতে পারে না।

যাই হোক, একদিন বছর দেড়েক পার করে সেই ফুলটুসি বাড়ি এসে সরিতাদের বাড়ি দেখা করতে এলো। সেই আগের ফুলটুসি যেন হারিয়ে গেছে। পাকা পোক্ত গিন্নি যেন, কথাবার্তায় শহুরে ভাব ভঙ্গি।

আমরা বললাম, “কি রে ফুলটুসি, কেমন আছিস? চলে আসলি? না আবার যাবি?”

তার উত্তরে সে যা বলল, বাড়ির সবাই তো শুনে অবাক। সে গম্ভীর হয়ে বলে উঠল, “না গো মামী, থাকলে হবে না, দাদার খুব কষ্ট হবে। আমাকে না হলে দাদাকে খেতে দেওয়ার, দেখাশোনা করার কেউ নেই গো। অফিস থেকে আসার পর চা করে দেওয়া থেকে খাবার দেওয়া, টিফিন করে দেওয়া—সব গুছিয়ে দিতে হয়।” আমরা বললাম, “কেন? ওখানকার দাদা বিয়ে করেনি? বউ নেই?” বলল, বউকে নাকি পছন্দ করে না। বউও কাজে বের হয়ে যায়, সংসারের কিছু দেখে না। আর ওই দাদা নাকি ওকেই ভালোবাসে। বউকে ডিভোর্স দিয়ে ফুলটুসিকেই বিয়ে করবে। অনেক বললাম, বড়লোক মানুষ ওরা, ওইসব ভালো কথায় ভুলিস না, দেখিস। কিন্তু ওর বিশ্বাস ভাঙার নয়। মাসখানেক থেকে চলে যাবে শুনলাম। পরে ওর মা কাজে এসেছিল। বলল, “আর বলো না, ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কারও কথা শোনার নাম নেই। সর্বদা কলকাতার ওই দাদার কথা।”

কদিন ধরে ওই ফুলটুসিই বাড়ির কাজ করতে আসছিল। সরিতার শাশুড়িমা রসিয়ে রসিয়ে ওর কাছে মনের কথাগুলো শুনত। একদিন বেলা হয়ে দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা—এক গাদা বাসন কলতলায় পড়ে আছে, ফুলটুসির দেখা নেই। আর সেদিন আসবে না বুঝতে পেরে সরিতা সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বেলে কাপড় কেচে সব বাসন নিয়ে ধুতে বসল। "কী জানি কী হল," মনে মনে ভাবে সরিতা।

সকালেও আসবে কি আসবে না তাই তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে পড়ে উঠোনটা জলের পাইপ হাতে করে ধুতে থাকে সরিতা। ধোয়া সবে হয়েছে ফুলটুসির মা কাজে আসে।

বলে, “কালকের বাসন সব ধুয়ে নিয়েছ? আর বলো না মামি মেয়ে আমার "ওমুক" বৌদির বাড়ি কাজ করতে গিয়ে কলতলায় পিছল ছিলো সাংঘাতিক ভাবে পড়ে গেছে। পা নিয়ে দাঁড়াতে পারছে না। আজ কাজ টাজ সেরে হাসপাতালে দেখাতে নিয়ে যাব।” বাড়ির সবাই শুনে বলল, “দেরি না করে আগে হাসপাতালে নিয়ে যাও।”

সেই হল কাল। ফুলটুসি ব্যথার ওষুধ খেয়ে ব্যথা কম থাকায় না গেল হাসপাতালে, না ডাক্তার দেখাল। কদিন পরেই পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এল সরিতাদের বাড়ি কাজে। সবাই মিলে বকাবকি করল, “কেন হাসপাতালে দেখাতে যাসনি?” শুনে ফিকফিক করে খানিক হাসল।

সরিতাকে একদিন ফুলটুসি বলল, “মামি, কলকাতার দাদা আমাকে ওখানে চলে যেতে বলছে। খুব অসুবিধা হচ্ছে দাদার, আমাকে ডাক্তার দেখিয়ে দেবে।” সরিতা বলল, “এই অবস্থায় যাবি কী করে? তোর মা যখন বারণ করছে, যাস না। ভালো করে এই মাসের মাইনেটা নিয়ে, আর কিছু লাগলে নিয়ে ভালো করে দেখা। ওইভাবে বলে বলে ওষুধ খাস না।”

মেয়েটার স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়া। পুজোয় ভালো জামা বা চুড়িদার নিলে সেটাও যত্ন করে তুলে রাখত—বিয়ের পর কত জামাকাপড় লাগবে, তখন পরব, উঠোন জুড়ে বাসন ধুয়ে একটা একটা করে আবার শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে সব তুলে রাখত, কাজ হয়ে গেলে হাতে সরিষার তেল চেয়ে পায়ে-হাতে বুলিয়ে নিয়ে খানিক বসে গল্প করে বাড়ি যেত।

কদিন ধরে কাজে আসতে পারছে না। ওর মা কাজে এসে জানায়, “পায়ের যন্ত্রণায় ছটফট করছে। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে এক্স-রে করিয়ে ছবি তুলে আনলাম। ডাক্তার দেখে বলল, কোমরের নীচের জয়েন্টের হাড় সরে গেছে। এতদিন পরে সেখানে মাংস জমে পচন ধরেছে।”

মেয়েটার সেই হল কাল। ডাক্তার আর ওষুধ করতে করতে ওর মা হাল ছেড়ে দিয়েছে। ওর মা রাগে বলে, “আর পারছি না গো, যা হয় হবে। কী করব? কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে গেল। ধার করেও  চেষ্টা করলাম, বাইরে নিয়ে যাবার ক্ষমতা নেই। পা দিয়ে রস গড়িয়ে পড়ছে, একদম আর হাঁটতেই পারছে না। পচন ধরে গন্ধে ঘরে টেকা যাচ্ছে না। ওর ভাই তো সারাক্ষণ ওকে গাল পাড়ছে, আর খেতেও পারছে না ভালো করে।” সরিতা ওর বড়জাকে সঙ্গে করে ওদের পাড়ায় একদিন কিছু বিস্কুট ফল নিয়ে দেখা করতে গেল। ফুলটুসিকে আর ফুলটুসি বলা যায় না। একে তো রোগা রোগা ,এরপর শুধু কঙ্কাল সার হয়ে গেছে। তবু সরিতা মামিরা যাওয়ায় খুব খুশি , বলল, “মামি, আমি কি ভালো হব না?” ওকে বুঝিয়ে  সরিতা বলল, “কেন হবি না? ঠিক ভালো হয়ে যাবি।” ফুলটুসি আবার সেই কলকাতার দাদার কথা বলে, “জানো মামি, আমার শরীর খারাপ শুনে দাদা আমাদের বাড়ি এসেছিল। মাকে অনেক টাকা দিয়ে গেছে, ভালো করে ডাক্তার দেখাতে বলেছে"। ওখানে ওকে দেখা যাচ্ছিল না, খুব কষ্ট হচ্ছিল। অত ভালো, প্রাণোচ্ছল মেয়েটার কী অবস্থা আজ! দেখে আসার দিন চারেক বাদে একদিন সকালে ওদের পাড়ার একটি মেয়ে এসে খবর দেয়—হার্ট ফেল করে মারা গেছে। সব স্বপ্ন, চাওয়া-পাওয়াগুলোকে নিয়ে না-ফেরা দেশে চলে গেছে।

ছবি সংগৃহীত 

 

0 Comments

Post Comment