এক টুকরো আকাশ (শেষ পর্ব)

  • 24 December, 2025
  • 0 Comment(s)
  • 108 view(s)
  • লিখেছেন : মীরা কাজী
ডাইরিগুলো নিয়ে আসার পর ইরাবতীদির বোনেদের সাথে আর কথা হয়নি। ইরাবতীদির মেজবোন মধুবন্তী দেবীকে ফোন করে নাম বলতেই তিনি  চিনতে পারলেন। সৌজন্যমূলক কুশল বিনিময়ের পর, ইরাবতীদির ডাইরিগুলো নিয়ে লেখা পাণ্ডুলিপিটা পড়ে দেখার অনুরোধ করতেই  তিনি  আমাকে হতবাক করে দিয়ে ফোনটা কেটে দিলেন।

 

                                                 (শেষ থেকে শুরু)

           

 

         সব কটা ডাইরি পড়া এবং সেগুলোকে যথাসাধ্য গুছিয়ে লেখা শেষ। এ কাজটি মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। গোটা একটা বছর সময় ও বহু নির্ঘুম রাত  লেগেছে।  তবু  এ পর্যন্ত সমস্তটাই  ছিল আমার নিজের আয়ত্তের মধ্যে। এর পরের কাজটিও বেশ  কঠিন। এবার এটাকে একটা বই এর আকার দিতে হবে। ইরাবতীদির তেমনই নির্দেশ ছিল। তার আগে ইরাবতীদির বোনেদের সঙ্গে একবার পরামর্শ করা দরকার।

       ডাইরিগুলো নিয়ে আসার পর ইরাবতীদির বোনেদের সাথে আর কথা হয়নি। ইরাবতীদির মেজবোন মধুবন্তী দেবীকে ফোন করে নাম বলতেই তিনি  চিনতে পারলেন। সৌজন্যমূলক কুশল বিনিময়ের পর, ইরাবতীদির ডাইরিগুলো নিয়ে লেখা পাণ্ডুলিপিটা পড়ে দেখার অনুরোধ করতেই  তিনি  আমাকে হতবাক করে দিয়ে ফোনটা কেটে দিলেন। এর পর বেশ কয়েকবার  ফোন করলেও তিনি আর ধরলেন না। অগত্যা ইরাবতীদির ছোটবোন দময়ন্তী দেবীকে  ফোন করলাম। তিনি ফোন ধরে আমার কথা শুনে বিরক্ত স্বরে জানালেন, তার মেজদি মধুমন্তী  অসুস্থ, সেই নিয়ে তারা ভীষণ  দুশ্চিন্তার মধ্যে আছে। এই সময় এ সমস্ত  আলোচনা ভালো লাগছে না। দিদির ডাইরিগুলো দেবার সময় পাণ্ডুলিপি পড়ে দেখার কথা তারা বলেছিল বটে তবে এখন তার প্রয়োজন নেই। তাদের দিদি ইরাবতী  অদ্ভুত ধরনের মানুষ ছিল। নিজের বাড়ির লোকের চেয়ে পরই তার কাছে চিরকাল গুরুত্ব পেয়েছে। বোনেদের  কথা তো দূর, মায়ের কথাই ঠিক মত ভাবত না। শেষ অবস্থায়  মাকে সে দেখেইনি। যা কিছু তারা দুই বোনে মিলে করেছে। তাদের বড়দি কেবল কিছু টাকা পাঠিয়ে কর্তব্য শেষ করেছে।  বড়দির উদ্ভট ইচ্ছা নিয়ে ভাববার সময় বা ইচ্ছা কোনওটাই তাদের নেই।  বই করার ইচ্ছা হলে আমি  নিজের  দায়িত্বে করতেই পারি। এ ব্যাপারে তাদের মত, অমতের  কোনও প্রশ্ন নেই।  তবে  কোনও রকম সহযোগিতা তারা করতে পারবে না।

          দময়ন্তী দেবী ফোনটা রেখে দেবার  পর মনটা খুব বিষন্ন হয়ে গেল। ইরাবতীদিকে যতটুকু দেখেছি, এবং তার ডাইরি থেকে তার সমন্ধে যতটুকু জেনেছি  তাতে করে, তার সঙ্গে তার বোনেদের আচরণ মেলাতে পারছি না। ব্যক্তিগত ডাইরিতে মানুষ মিথ্যা কথা লেখে না। ইরাবতীদি তার বোনেদের  সন্তানের মত লালন-পালন করেছেন। সারা জীবন ধরে তাদের আগলে রেখেছিলেন। যতদূর জেনেছি, ইরাবতীদির  মৃত্যুর পরে  তার সঞ্চিত টাকা দুই বোন ভাগাভাগি করে নিয়েছে। বাঁকুড়ার বাড়িটাও তারা সাত তাড়াতাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে। এখন তার সামান্য ইচ্ছেটুকু তাদের কাছে উদ্ভট বলে মনে হচ্ছে। তাছাড়া আরও একটা কথা ভেবে আশ্চর্য লাগল, মধুমন্তী দেবীর  সাথে কথা বলে তাকে অসুস্থ বলে মনে হয়নি। তিনি নিজেও সে কথা বলেন নি। 

   ইরাবতীদির বোনেদের সঙ্গে আর কোনও কথা নয়। যা করার নিজেকেই করতে হবে। তাছাড়া এখানে ইরাবতীদির ইচ্ছা ছাড়া আমার নিজের ও একটা স্বার্থ জড়িয়ে আছে। এতদিন ধরে ডাইরিগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করে এতগুলো পাতা লেখার পিছনে  আমার যে  পরিশ্রম, তাকে ব্যর্থ হতে দিতে পারি না। 

   অনেক জায়গায় ঘোরা ঘুরি করে একজন প্রকাশকের সাথে কথা ফাইনাল করে ফেললাম।   

    এমন সময় আমার জীবনে চরম বিপর্যয় ঘটে গেল। যার কারণে আমার চিন্তা, চেতনা, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সমস্ত তালগোল পাকিয়ে গেল। একদিন প্রকাশকের সঙ্গে দেখা  করতে  যাবার সময় আচমকা একটা মোটর বাইকের সামনে পড়ে গেলাম। নিজেকে সামলাতে গিয়েও পারলাম না। প্রচন্ড একটা ধাক্কা খেয়ে  আমি খানিকটা দূরে ছিটকে পড়ে গেলাম।  তারপর কী হয়েছে আমার জানা নেই। 

     পরে জেনেছি, আমাকে ওই মোটর বাইকটা ধাক্কা দিয়ে চলে গেলে, ওখানকার কিছু মানুষ আমাকে স্থানীয় একটা নার্সিংহোমে ভর্তি করে দেয়। এই গণ্ডগোলের ভিতর আমার ব্যাগটা কেউ তুলে নিয়ে চলে যায়। তাই আমার বাড়ির ঠিকানায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। আমকে বাড়ি ফিরতে না দেখে আমার স্ত্রী চিন্তিত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত পুলিশের সাহায্যে আমার সন্ধান পায়। মাথায় বিরাট ক্ষত নিয়ে আমি তখন নার্সিংহোমের বেডে অচেতন হয়ে পড়ে আছি।

      আমার জ্ঞান ফেরে, তবে কিছু মনে  করতে পারি না। বাড়ির মানুষগুলোকে  চিনতেও  অসুবিধে হয়। ডাক্তার বাবু বলেন আমার মাথায় বড় রকম চোট লেগেছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে কিছুদিন সময় লাগবে।

      প্রায় তিন মাস একটানা  চিকিৎসার পর  আমার মাথার ক্ষত সারে, আমি শারিরীক ভাবে সুস্থ হয়ে বাড়ি  ফিরি। তবে আমার স্মৃতি পুরোপুরি ফিরে আসে না। এই আধো অন্ধকার, আধো আলোর জগৎটার মধ্যে কাটানো দিন গুলো কী দূঃসহ ছিল বলে বোঝাতে পারব না। কিছু মনে করতে গেলে মাথার মধ্যে সহস্র কীট যেন দংশন করত। ডাক্তার বাবুর কথায় বিশ্বাস রাখতে পারতাম না। নির্ঘুম  রাত পায়চারি করে কেটে যেত। একটা ভয় আমাকে সর্বক্ষণ  তাড়া করত- আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি! 

        পুরোপুরি স্বভাবিক হতে প্রায় একবছর সময় লেগে যায়। এরপর অন্যান্য  সমস্ত কিছুর মত ইরাবতীদির পাণ্ডুলিপিটার কথা আমার মনে পড়ে। খোঁজ  করতে গিয়ে জানতে পারলাম,বাইক দূর্ঘটনার  সময় আমার ব্যাগের সমস্ত জিনিসের সাথে পাণ্ডুলিপিটাও বেহাত হয়ে গেছে। 

        কথাটা শোনার পর আমি মানসিক ভাবে খুব ভেঙ্গে পড়লাম।  স্মৃতি ফিরে এসেও আবার নতুন করে ডিপ্রেশনের  শিকার হয়ে গেলাম। কিছুই ভালো লাগে না। মনে হয় আমার চারপাশের পৃথিবীটা যেন থমকে গেছে। সংসারের ছোটো-খাটো কাজও আমার কাছে বোঝা বলে মনে হয়। আমার স্ত্রীকে একাই সব দিক সামলাতে হয়। আমার স্ত্রীই আমাকে পরামর্শ দিল- ডাইরিগুলো তো আছে, সেগুলো থেকে আবার নতুন করে লেখা শুরু করতে।  আমিও একথা  ভাবি না তা নয়, তবে ভিতর থেকে কোনও উৎসাহ পাই না। ডাইরিগুলো নাড়া চাড়া করি, কিন্তু এক লাইনও লেখা হয় না। বুঝতে পারি, আগে বহু কষ্টে যেটা সম্ভব হয়েছিল, এই মুহুর্তে সেটা কোনও মতেই আর সম্ভব নয়।

      ইরাবতীদির শেষ ইচ্ছেটা পুরণ করা হল না। খুব মনোকষ্টে ভুগি। মাঝে মাঝে ইরাবতীদিকে স্বপ্নে দেখি, দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখখানি বিষাদ মাখা। সেদিন আরও মন খারাপ হয়ে যায়। 

  এভাবে প্রায় সাত-আট মাস কেটে গেছে। হঠাৎ একদিন এক ভদ্রলাক ফোন করে আমার বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলেন। তিনি আমার সাথে দেখা করতে চান। ভাবলাম, ব্যাংকজনিত কোনও সমস্যায় পড়ে পরামর্শ চাইবেন নিশ্চয়। এরকম অনেকেই আসেন।

    পর দিন একটু বেলার দিকে কয়েকজন ভদ্রলোক ও ভদ্র মহিলা আমার সাথে দেখা করতে এলেন। আমি তাদের একবারেই চিনি না। নমস্কার বিনিময়ের পর  বললেন, তারা আমার হারিয়ে যাওয়া কিছু আমাকে ফেরত দিতে এসেছেন। তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে, তাদের একজন আমার সেই হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপিটা আমার টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। আমি ঠিক দেখছি! নাকি আমার চোখের ভুল! নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। কিছু না বলে চোখ বন্ধ করে চুপ করে থাকলাম। যারা একটু লেখালেখি করে তারা বুঝতে পারবে এক বছর  ধরে পরিশ্রম করে তৈরি করা পাণ্ডুলিপি শেষ মুহুর্তে হারিয়ে গেলে কেমন হতে পারে, আবার সেটা যদি কারও স্মৃতি বিজড়িত হয়ে থাকে।

   “এটা আপনারা কোথায় পেলেন?”  নিজেকে সামলে নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম।

   আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি  যা বললেন, সেটাকে অত্যাশ্চার্য ঘটনা বললে অত্যুক্তি হয় না।  

          একটা পার্কের  ঝোপের মধ্যে পাণ্ডুলিপিটাকে পড়ে থাকতে দেখে কৌতূহল বশত  তিনি সেটাকে তুলে নেন। দুর্ঘটনার সময় সবার অলক্ষে যে মানুষ আমার ব্যাগটা তুলে নিয়েছিল, সে  পার্স ও মোবাইলটা নিয়ে বাকি যা কিছু  ফেলে দেয়। 

 ভদ্রলোকটি  কলেজস্ট্রিট এসেছিলেন কিছু বই পত্র কিনতে। কাজ সারা হলে তার নির্দিষ্ট ট্রেনের দেরি আছে দেখে স্টেশনের কাছাকাছি একটা পার্কে বসে সময় কাটাচ্ছিলেন। কুড়িয়ে পাওয়া পাণ্ডুলিপিটির প্রথম কয়েকটি পাতা ছেঁড়া। পাতা  ওল্টাতে গিয়ে অনেক জায়গায় “ইরাবতী” নামটি দেখে তিনি কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। ওই নামে একজনকে তিনি চিনতেন।  কিছুটা পড়বার পর তার অনুমান সত্য বলে মনে হয়। বুঝতে পারেন- ইনিই  সেই ইরাবতী সেন,  যার সঙ্গে তিনি কিছুদিন একই কলেজে পড়িয়েছিলেন।

      তিনি পাণ্ডুলিপিটি  সযত্নে ব্যাগে ভরে নেন। এরপর তিনি ইরাবতী দেবীর পরিচিত জনের খোঁজ করতে থাকেন। তিনি সোনামুখী শহরের  মানুষ। তাই ইরাবতী দেবীর  অনুরাগীদের খোঁজ পেতে দেরি হয় না। তার সবাই এখন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তবে আগের মতই যোগাযোগ রেখে চলেছেন।  ফোন পেয়ে তারা দেরি করলেন না। ওই ভদ্রলোকের  বাড়ি চলে এলেন।   

   নামগুলো পরিবর্তিত হলেও লেখা  পড়ে তাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না এটা তাদেরকে নিয়েই লেখা। তাদের প্রিয় ইরাবতীদি এটা কাউকে দিয়ে লিখিয়েছেন।    

         লেখক যেই হন, তিনি এটাকে বই করবে ভেবে অনেকদূর এগিয়েছিলেন।  কিন্তু এটা এভাবে ফেলে দিলেন কেন?  তিনি যদি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদল করেও  থাকেন, তাই বলে লেখাটাকে নিজের কাছে না রেখে, এভাবে ফেলে দেবেন? এই ব্যাপারটা কিছুতেই তাদের বোধোগম্য হয় না। যাই হোক, এটা তাদের হাতে যখন এসে পড়েছে এটাকে তারা নষ্ট  হতে দেবেন না। সবার আগে লেখককে খুঁজে বের করতে হবে। পাণ্ডুলিপির  কোথাও  লেখকের আসল নাম, ঠিকানা পাওয়া গেল না।  প্রথমদিকের কয়েকটি পৃষ্ঠা নেই। সেখানে নিশ্চয় ছিল। 

    পাণ্ডুলিপির শেষ পৃষ্ঠায়  প্রকাশকের নাম, ফোন নম্বর লেখা ছিল। প্রকাশককে ফোন করে তারা জানতে পারেন,  কিছুদিন আগে এই রকম একটা পাণ্ডুলিপি একজন নিয়ে এসেছিলেন। তার সাথে সমস্ত কথাবার্তাও হয়েছিল। কিন্তু তিনি আর কোনও যোগাযোগ করেননি। 

        প্রকাশকের কাছ থেকে লেখকের ফোন নম্বর পাওয়া গেল। ব্যাস, তারপর আর কী? ফোন করে সোজা এখানে।

   সমস্তটা শুনে আমি একেবারে থ। এরকমও হয়! কোথায় কলেজস্ট্রিট আর কোথায় সোনামুখী! ভাগ্য সহায় থাকলে অসম্ভবও বুঝি এভাবে সম্ভব হয়ে ওঠে।

  বলা নিষ্প্রয়োজন, এরা সবাই  ইরাবতীদির  সেই সব ভাই-বোন, স্মৃতি- দৌর্বল্যের কারণে মনের মণিকোঠায় তিনি যাদের আর ধরে রাখতে পারছিলেন না। তাই  অসুস্থ শরীরে, দুর্বল স্মৃতি নিয়ে, কাঁপা কাঁপা হাতে ডাইরির পাতায় তাদের অক্ষরবন্দী করে রাখতে চেয়েছেন।   

 এরপর বাকিটা খুব সহজে হয়ে গেল। এতগুলো  মানুষের সাহচর্যে আমি আবার নিজের  ভিতর  নিজেকে ফিরে পেলাম। আমার চারপাশের  স্থবির পৃথিবীটা আবার বেগবান হয়ে উঠল। নতুন উদ্যমে হারিয়ে যাওয়া পাতা কয়টি পুনরায় লিখে জুড়ে দিলাম। সবাই মিলে বইটির নাম ঠিক করলাম,” একটুকরো আকাশ”। ইরাবতীদির ভাই বোনেদের সাথে আমিও একই ফ্রেমে বন্দী হয়ে গেলাম। 

      প্রকাশকের অফিসে পাণ্ডুলিপিটা জমা দিয়ে এলাম। সব কাজ শেষ।  অনেকদিন পর নিজেকে ভারমুক্ত মনে হচ্ছে। রাতে ইরাবতীদিকে স্বপ্নে দেখলাম, দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে আগের মতই স্নিগ্ধ হাসি। 

                                              * সমাপ্ত*


লেখক : কথাসাহিত্যিক 

ছবি : সংগৃহীত 

0 Comments

Post Comment