শিরশ্ছেদ ও প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া

  • 28 October, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 90 view(s)
  • লিখেছেন : সরিতা আহমেদ
যেটা নিয়ে আমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হচ্ছে তা নিজের পড়শিদের একাংশের ভাবনা। শরিয়ত অনুযায়ী সৌদির সরকার যে ধরনের নির্মমতার উদাহরণ নিত্য নতুন তৈরি করছে, সেগুলি নিয়ে সুস্থ আলোচনায় যেসব মন্তব্য উঠে আসছে নিজেদের সহনাগরিকদের এবং পড়শি দেশবাসীর একাংশের থেকে, তা ভয়াবহ। কট্টর মুসলিমদের একাংশ এই নারকীয় বিধানকে সমর্থনই শুধু করছে না, তারা চাইছে বাংলাদেশসহ আশেপাশের দেশেও এইরকম শরিয়তি সাজা স্থাপিত হোক। এর পেছনের কারণ হিসেবে তারা আধুনিক মেয়েদের ব্যক্তি স্বাধীনতা, আদবকায়দা, পোশাক ও পেশাকে দায়ী করছে।

গোটা পশ্চিমবঙ্গ যখন দুর্গোৎসব নিয়ে মেতে আছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশের দুই নাগরিকের উপর নেমে এল ভয়ংকর এক রাষ্ট্রীয় বিচার। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বিধান মেনে দুই নর-নারীর শিরশ্ছেদ করা হল। সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরঞ্জন বাদ দিলে যেটুকু খবর পাওয়া যায় তা হল -

 মক্কার একটি মসজিদের ভিতরে ‘অশালীন কাজ’ করার অপরাধে বাংলাদেশের দুই নাগরিককে ১৪ অক্টোবর ২০২৬-এ  শরিয়তি আইনের নিয়মে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল, মক্কার কোন মসজিদে ঘটনাটি ঘটেছিল, যুগলের কোনও আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ ছিল কি না, তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পেরেছিলেন কি না, বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, এমনকি তাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে আগে কেন জানানো হয়নি— এসব বিষয়ে এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। সৌদি প্রেস এজেন্সিতে প্রকাশিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, অভিযুক্ত দুজনের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আখতার। তাঁরা দুজনেই বাংলাদেশের নাগরিক। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁদের দম্পতি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, তাঁরা আইনত বিবাহিত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।

এতগুলো ধোঁয়াশা থাকলেও যে প্রশ্নটি অবাধ্য জিজ্ঞাসা হয়ে বেরিয়ে আসতে চায় তা হল – অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, একটি আধুনিক সার্ব্বভৌম রাষ্ট্র কি এরকম শিরশ্ছেদের মত মধ্যযুগীয় মৃত্যুদণ্ডাদেশ বলবৎ করতে পারে?

ওয়াকিবহাল মহল বলবে, পারে। যে দেশের ভিত্তি ইসলামি শরিয়ত আইন, সেখানে পুরুষের বহুবিবাহ, একাধিক উপপত্নী রাখা যেমন ধর্মসম্মত, তেমনি দুষ্কৃতীর হাত কেটে নেওয়া, ব্যাভিচারীদের প্রকাশ্যে পাথর ছুঁড়ে হত্যা অথবা শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড বলবৎ করাও ন্যায়সম্মত। আধুনিক যুগে এহেন মধ্যযুগীয় শরিয়ত আইন বলবৎ রাখা কতখানি যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছে, সে চলতেই পারে। কিন্তু অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানালের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির দীর্ঘদিনের আবেদন নিবেদনের সমস্ত প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সৌদি সরকার নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখছে। কারণ তারা জানে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রদের কোনও না কোনও কারণে সৌদির কাছে হাত পাততেই হবে। একটা পাকাপোক্ত অর্থনৈতিক অবস্থানে থাকার সুবিধা এটাই।

তবে যেটা নিয়ে আমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হচ্ছে তা নিজেদের সহনাগরিকদের এবং পড়শি দেশবাসীর একাংশের মনোভাবনা। শরিয়ত অনুযায়ী সৌদির সরকার যে ধরনের নির্মমতার উদাহরণ নিত্য নতুন তৈরি করছে, সেগুলি নিয়ে সুস্থ আলোচনায় যেসব মন্তব্য উঠে আসছে আমাদেরই সহনাগরিক অথবা পড়শিদের থেকে, তা ভয়াবহ। একটা দেশের আইন মোতাবেক যদি কেউ দোষী সাব্যস্ত হয় তবে নৈতিক নিয়মেই সেই দেশের আদালতে দোষীর আত্মপক্ষ সমর্থনের উপায় থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এক্ষেত্রে এসব কিছুই হয় নি। তারপরেও কট্টর মুসলিমদের একাংশ এই নারকীয় বিধানকে সমর্থনই শুধু করছে না, তারা চাইছে বাংলাদেশসহ আশেপাশের দেশেও এইরকম শরিয়তি সাজা স্থাপিত হোক। এর পেছনের কারণ হিসেবে তারা আধুনিক মেয়েদের ব্যক্তি স্বাধীনতা, আদবকায়দা, পোশাক ও পেশাকে দায়ী করছে। এই যুগে দাঁড়িয়ে কতখানি নারীবিদ্বেষী ও হিংস্র হলে সোশ্যাল মিডিয়ার মতো খোলা হাটে নিজের সহনাগরিকদের সম্পর্কে এইরকমের বীভৎস চিন্তাভাবনার কথা লিখতে পারে! অথচ এরাই আরব শেখদের উপপত্নী রাখা, তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে নানা পন্থায় চুরি হওয়া বাচ্চা মেয়েদের দিয়ে নিজেদের হারেম পূর্ণ করার মতো অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজের ব্যাপারে একেবারেই নিশ্চুপ। একটি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখলে পাওয়া যায়, বাংলাদেশ সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের (Wage Earners' Welfare Board) সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে মোট ২৫০ জন বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মীর লাশ দেশে ফেরত আনা হয়েছে। এদের মধ্যে অন্তত ৬৪ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে 'আত্মহত্যা' উল্লেখ রয়েছে। 

যা নিয়ে সন্দেহ জ্ঞাপক প্রশ্ন তুলেছেন মৃতদের পরিজন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলিও। তাদের অভিযোগ সৌদি আরবের কড়া নিয়ম, কাজের অমানবিক পরিবেশের পাশাপাশি নারীরা মারাত্মক তীব্র শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ফলে এই সমস্ত মৃত্যুকে আর স্বাভাবিক বা আত্মহত্যা প্রতিপন্ন করা চলে না। হাতের মুঠোয় বিশ্বের খবর থাকলেও পুরুষতান্ত্রিক মন্দবুদ্ধির লোকজন সেসব ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করে নারীকে গৃহবন্দী করার, কথা না শুনলে প্রহার করার এমনকি মধ্যযুগীয় বর্বরতায় হত্যা করারও। একবারও তারা চিন্তা করে না তাদের সহনাগরিক ভাই-বোনেরা নিজেদের পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদনের উদ্দেশেই প্রবাসী হতে বাধ্য হয়েছে। সেখানে তাদের জীবন যখন বিপন্ন হচ্ছে তখন তারা সামান্য সহানুভূতিটুকুও পাচ্ছে না তাদেরই চেনা পড়শিদের থেকে। এর কারণ সৌদি আরব মানেই তাদের কাছে হজ্জ্বের দেশ, পাপস্খালনের দেশ, মোক্ষলাভের দেশ, আল্লাহের দেশ, অতএব সেখানে যা কিছু ঘটছে বা ঘটেছে তা সব সমালোচনার ঊর্ধ্বে!

আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একশ্রেণির নাগরিক যখন তাদের ঘৃণ্য মস্তিষ্কে এইসব নারী-স্বাধীনতা বিরোধী নৃশংসতার চাষ করছে, তখন তাদের কাউন্টার করতে মুদ্রার ঠিক উল্টো দিকে দাঁড়াচ্ছে ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদের বিজ্ঞাপনধারীরা।

“এই নাকি শান্তির ধর্ম!” “এরা রক্তবীজের বংশধর, অতএব এদের থেকে দেশ বাঁচাতে জোট বাঁধুন।" “কোনওভাবেই ওদের বাড়তে দেওয়া যাবে না, নইলে এখানেও শরিয়া আইন এসে যাবে! ফলে ওরা যদি তিনটে বাচ্চার জন্ম দেয়, আপনারা পাঁচটা দেবেন।" - একটা সময় যেসব সাম্প্রদায়িক খোঁচা, গালিগালাজ বা বক্রোক্তিগুলি পাড়ার মোড়ে চায়ের ঠেকে শোনা যেত, সেগুলিই ফ্রি-ডেটার দৌলতে আজকাল সোশাল মিডিয়ার কমেন্ট বাক্সে দেখা যায়।

একথা অনস্বীকার্য যে মারমুখী পড়শিদের মোকাবেলা করতে হলে ‘ফোঁস’ করার মন্ত্রগুপ্তি মেনে চলাই ভাল, নইলে অস্তিত্বসংকট অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু ফোঁস করার সঙ্গে ছিটকে আসা বিষের থুতু যদি দেশের নাগরিকদেরই অস্তিত্বসঙ্কটের মুখে ফেলে দেয় তখন ভাবতে হয় বৈ কি! সারা বিশ্বজুড়ে এখন পুঁজিবাদী ডানপন্থী সরকারের রমরমা। ভারতের মতো বহুমাত্রিক দেশে যেখানে সুদীর্ঘকাল থেকে “বিবিধের মাঝে মিলন মহানে”র চিরায়ত ধারাস্রোতের ইতিহাস রয়েছে, সেখানে তার প্রতিবেশী দেশের ( বিশেষত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান – যেখানে ইসলামি মৌলবাদের আগ্রাসন চরম) নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে দুঃখ দুর্ভাবনা যেমন অবশ্যম্ভাবী, তেমনি নিজের নাগরিকদের প্রতিও একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশ দেওয়াও জরুরি হয়ে ওঠে। কারণ সকলেই বিশ্বগ্রামের অধিবাসী, সকলেই ফ্রি-ডেটার খাদক এবং বহুক্ষেত্রেই রটনা ও বিভ্রান্তির শিকার। 

ঠিক এই জায়গাতেই ভারতের মত বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের চালকদের একটি বাস্তবোচিত কঠিন পন্থা নিতে হবে, যার শিকড়ে থাকবে সৌভ্রাতৃত্বের উদারনৈতিক পুষ্টিগুণ – যা কোনও মূল্যেই আমাদের ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’কে টলাতে পারবে না।

 

লেখক: শিক্ষক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক 

ছবি: সংগৃহীত 

0 Comments

Post Comment