SIR ও নারীদের কিছু বাস্তব চিত্র

  • 03 January, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 88 view(s)
  • লিখেছেন : শ্রীরূপা মান্না
মেয়েদের অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। একটা উদাহারণ দিই, স্বামী স্ত্রীর SIR এর ফর্ম ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন, ফলে ভাইয়ের বাড়িতে বাস করা  স্ত্রী-র কাছে সেটা সময়মতো পৌঁছোয়নি। স্ত্রী সংসারের হাল ধরতে বাইরের রাজ্যে পরিচারিকার কাজ করতে গেছে, তার SIR ফর্ম বাড়ির কেউ পূরণ করে দেয়নি। SIR এর জন্য বাবার ভোটার কার্ডের নম্বর চেয়েছে মেয়ে, যেহেতু পালিয়ে বিয়ে করেছে, তাই মেয়েকে তথ্য দেয়নি বাবা।

চূড়ান্ত অব্যবস্থা, ভয়ানক খারাপ ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ভীষণ কম কর্মী, সিদ্ধান্তহীনতা, সরকারি খামখেয়ালিপনা, সামাজিক সচেতনতাবিহীন একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে SIR এর কাজ চলছে আমাদের রাজ্যে। প্রথম দফার কাজ শেষ হওয়ার পর বোঝা গেল সুষ্ঠভাবে সঠিক প্রক্রিয়াতে এই কাজ করতে ন্যূনতম সময় লাগা উচিত এক বছর। কিন্তু এ দেশে ভোট বড় বালাই, ফলে দশমাসের কাজ দশদিনে করে ফেলার নামই যে গণতন্ত্র, সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে সরকারি-আধা সরকারী কর্মী থেকে আরম্ভ করে সাধারণ প্রতিটি মানুষ। আর এই কাজের ফলাফল দাঁড়ালো, ৫৮ লাখের বেশি ভোটারদের নাম বাদ গেল অনুপস্থিত, অন্যত্র বসবাসকারী, ডুপ্লিকেট অথবা মৃত হিসেবে। এই চারটি অপশনের মধ্যে 'মৃত'-র সংখ্যাটিও যে নির্ভুল তা কিন্তু বলা যাচ্ছে না। বহু জায়গাতে, জীবিত মানুষকে মৃত বলা হয়েছে ভুলে। এছাড়া ২০০২ এর লিস্টের সাথে ম্যাপিং করানো যায়নি এরকম সংখ্যা হ'ল, ৩১৩৮৩৭৪। এই ম্যাপিং কেন হয়নি, কেন করানো যায়নি, তার বিবিধ কারণ আছে। সেই কারণগুলির মধ্যে থেকে কিছু বিষয় তুলে ধরলেই পরিষ্কার হবে চিত্রটা।

 

ব্লক স্তরে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, অন্য জায়গাতে বাস করার জন্য যাদের ম্যাপিং করানো যায়নি, তাদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা বেশি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিয়ে করে চলে যাওয়া, সংসার ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া, পরিবারের সাথে যোগাযোগ না রাখার ইত্যাদিই কারণ। তবে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে যাওয়ার সংখ্যাও কম নয়, তাতে অবশ্য নারী পুরুষ সমানেই আছেন। আরেকটা অংশ যাদের ম্যাপিং করা যায়নি, তাদের ডক্যুমেন্টস নেই কিছুই। এই সংখ্যাটা অবশ্য বিভিন্ন জায়গার কারণে হেরফের হয়েছে। জঙ্গলমহলের দিকে লোধা পরিবারের সদস্যদের যে সমস্যার মুখোমুখি পড়তে হয়েছে, সেটা বাকি অংশে একই নাও হ'তে পারে। SIR এর কাজ শুরু হবার আগে থেকেই মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল তা মূলত আসামসহ অন্যান্য রাজ্যে NRC এর পরবর্তী চিত্র দেখে। সেই আতঙ্ক খানিক কমেছিল BLO এর কাজে একদম এলাকাবাসী আধাসরকারি বা সরকারি কর্মীদের নিয়োগের ফলে। কারণ এই BLO দের এলাকার সকলেই চেনেন, আবার একই সাথে কাজটাও সহজ হয়েছিল কারণ BLO রাও প্রত্যেককে চেনেন, ফলে কারওর আত্মীয়ের পার্ট নম্বর বার করতে বেগ পেতে হয়নি। এতদূর অনেকটাই নির্বিঘ্নে মিটলেও, নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে হিয়ারিং-এ ডাকা নিয়ে। যেহেতু বহুরকম ডক্যুমেন্টস জোগাড় করে ম্যাপিং যাদের হয়নি তাদের ডাকা হয়েছে ব্লকের অফিসগুলোতে, অনেকের মধ্যেই সেই পুরনো আতঙ্ক ফিরে এসেছে। এই যে ম্যাপিং না হওয়া অংশ, এরা মূলত খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত অংশও বটে। ফলে ক্ষমতাহীন হয়ে চলার জন্য যে ভয় তাদের সমাজে টিকে থাকতে এমনিই গ্রাস করে থাকে, সেটা বেড়েছে কয়েক গুণ। এর সাথে সঙ্গ দিয়েছে সঠিক তথ্য না জানার অজ্ঞানতা। একটা প্রশ্ন প্রায়ই শুনতে হয়, "দিদিমণি নাম বাদ গেলে কি জেলে দিয়ে দেবে?" এই যে অসহায়তা, এটাকে অতিক্রম করার মত সদুত্তর কারওর কাছেই নেই কারণ সকলেই প্রক্রিয়াটি নিয়ে আলো-আঁধারির মধ্যেই কাটাচ্ছেন।

 

এসব তো গড়পড়তা একটা অবস্থার কথা বলা গেল। মেয়েদের অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। একটা উদাহারণ দিই, স্বামী স্ত্রীর SIR এর ফর্ম ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন, ফলে ভাইয়ের বাড়িতে বাস করা  স্ত্রী-র কাছে সেটা সময়মতো পৌঁছোয়নি। স্ত্রী সংসারের হাল ধরতে বাইরের রাজ্যে পরিচারিকার কাজ করতে গেছে, তার SIR ফর্ম বাড়ির কেউ পূরণ করে দেয়নি। SIR এর জন্য বাবার ভোটার কার্ডের নম্বর চেয়েছে মেয়ে, যেহেতু পালিয়ে বিয়ে করেছে, তাই মেয়েকে তথ্য দেয়নি বাবা। বহু অসুবিধের মুখে মেয়েদের পড়তে হয়েছে এই সামান্য ফর্ম ফিল আপ করতে গিয়েই। ফলে ওই যে আতঙ্কের কথা বলছিলাম, সেটা মেয়েদের মধ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। দেখা গেছে মেয়েরা অনেকেই তাদের ছোটবেলার স্কুলে ভিড় জমিয়েছেন, স্কুলের থেকে একটা সার্টিফিকেট পাওয়ার আশায়। আর যারা স্কুলে হয়তো কখনও পড়েননি, তারা ব্লক অফিস, পঞ্চায়েত বিভিন্ন জায়গাতে গিয়ে বাসস্থানের প্রমাণপত্র জোগাড় করতে চেয়েছেন। একটি পরিবারে নারীদের অবস্থান এমনিতেই পিছনের সারিতে, ফলে তাদের অসহায়ত্ব, আশঙ্কা এবং নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে ভাবিত কেউই নয়, না পরিবার না রাষ্ট্রযন্ত্র। এই ভয়টুকু নিয়েই হয়তো তারা যাবেন হিয়ারিং-এ। এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো কিছু তথ্য দিতে পারবেন, আবার কেউ কেউ কোনও কিছুই দিতে পারবেন না। তারা আবার আশঙ্কায় দিন গুণবেন কোনদিন না রাষ্ট্রের নির্দেশে ডিটেনশন ক্যাম্পে জায়গা হয়। আসলেই "নারীর কোনও দেশ নেই" তাও আবার নিম্নবিত্ত মানুষ হ'লে তো কোনও কথাই নেই, এই অদ্ভুত অসহায়ত্ব নিয়েই তারা সহনাগরিক হয়ে বেঁচে থাকবেন।

 

এই লেখা যখন লিখছি তখন নিজেরাই ডুবে আছি অনেকরকম কাজের চাপে, তবুও লিখছি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে কারণ আমরা যারা ফুট সোলজারের ভূমিকায় ঢাল তরোয়াল বিহীন নিধিরাম সর্দার হয়ে নেমেছি হীরকরাজার নির্দেশে, তাদের তো কোথাও একটা কিছু বলার জায়গা থাকা দরকার। হয়তো ক্ষোভ উগরে দিচ্ছি, মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে অসম্ভব অসহায়তার মধ্যে আছি, তাই নিজস্ব অভিজ্ঞতার সাথে একদমই নিজেদের কথাটুকু ভাগ করে নিলাম।

 

লেখক : সরকারি কর্মী, সমাজকর্মী ,প্রাবন্ধিক

ছবি : সংগৃহীত

 

0 Comments

Post Comment