- 20 December, 2025
- 0 Comment(s)
- 259 view(s)
- লিখেছেন : শুভ প্রতিম
অশ্রু গ্রন্থি বা ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড থেকে অশ্রু নিঃসরিত হয়। চোখের ওপরের কোন থেকে ‘উচ্ছ্বসিয়া ওঠে যেথা নির্বারিত স্রোতে’। কিন্তু অশ্রুই যাঁদের শুকিয়ে যায়? হালফিলের বাংলায় বা বাইরে এমন কিছু নারীর নাড়ির কথা এখানে রাখা হল যাঁদের কান্না শুকিয়ে গেছে। কোথাও কর্কশ কোথাও অস্ফুট বয়ানে যা উঠে এসেছে এখানে তার মুদ্রিত রূপ। মার্জনা করবেন অসম্পূর্ণতার দোষে দুষ্ট এই রচনা।
শিলা বিবি যখন শিলা বেওয়া হলেন
পেটে তখন সন্তান, চার মাসের। মুর্শিদাবাদের জলঙ্গী ব্লকের ঘোষপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে সুবিশাল চর এলাকা। এক সময় পদ্মা নদী ছিল মুর্শিদাবাদ ও রাজশাহী এই দুই জেলার সীমান্ত। এপারে মামার বাড়ি তো ওপারে পিসির বাড়ি। র্যাডক্লিফের রোয়েদাদ এক লহমায় তা দুই দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তে পরিণত করলো। গঙ্গা শুধু ভারতের থাকলো না, ভাগ নিলো পাকিস্তান। ফরাক্কায় ব্যারেজ বানানো হল, নদীকে কৃত্রিমভাবে বেঁধে রাখার ফল পাওয়া গেল দশক ঘুরতেই। পদ্মা তার গতিপথ বদল করলো কয়েকবার। নদী পারের গ্রামগুলো হল তছনছ। করাল ভাঙনে ভেসে গেলো বহু গ্রাম। গ্রামের মানুষগুলো হয়ে গেলো উদ্বাস্তু। কালক্রমে পদ্মা আবার পূর্বে সরে গেলে, আরও পরে গজিয়ে উঠলো চর। এমনই এক চরে ছিল শিলা বিবির সংসার। এক কালের নদীর পারের শস্য শ্যামলা পরাশপুর গ্রাম ভাঙনের পর হয়ে গেলো চর পরাশপুর। এক সময়ের কৃষি ও কৃষ্টি নিয়ে থাকা গ্রামীণ সমাজ পাল্টে গেলো। ছিল পাটে, ধানে, বাউলে, কীর্তনে, জারীগানে। পাশেই বাংলাদেশ, সীমান্ত পথে পাচার হতে থাকলো গরু, ফেন্সিডিল সিরাপ। ওপার থেকে আসতে লাগলো মানুষ, নারী পাচারের কেন্দ্র হয়ে উঠলো চরগুলো।
ভাঙনের ফলে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো গ্রামগুলি। মাঝখানে শুকিয়ে যাওয়া পদ্মার ওপারে চর পরাশপুর প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে। গ্রামের পুরুষরা বেশিরভাগ কাজ করে বাইরের রাজ্যে। কেরালায় বেশি। এছাড়া দিল্লী, রাজস্থান, গুজরাট আছে। বাকিরা পাচার অর্থনীতির পুতুল। আন্তঃরাজ্য পাচার চক্রের সঙ্গে পুলিশ, প্রশাসন, বি এস এফ ও রাজনৈতিক নেতা সকলেই যুক্ত। এই চক্রের শেষ ঘুঁটি চরের মানুষ, অথচ নির্যাতন, খুন তাঁদেরই ভাগেই। ‘ট্রিগার হ্যাপি’ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ট্রিগার তাক করে থাকে তাঁদের দিকেই। বখরা কম পড়লে বা ‘ওপর থেকে নির্দেশ’ এলে তারা ‘কর্তব্যপরায়ণ’ হয়ে ওঠে। খুন করে সীমান্তবাসীদের।
১৭ এপ্রিল, ২০১৫ হতভাগী শিলার স্বামী, ইমাজুদ্দিন মণ্ডল বি এস এফের ট্রিগারের শিকার হয়। কোনও বিচার, দোষী বি এস এফ জওয়ানের শাস্তি? না সেসব কিছুই হয়নি। আমাদের দেশে এক অলিখিত নিঃশাস্তির সুবিধা পেয়ে থাকে নিরাপত্তা বাহিনী। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রায়ে শিলা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন সামান্য কিছু টাকা। কিন্তু ক্ষতির পিছনের কারণগুলি ‘অধরা’ থেকেই গেলো।
বাংলার মুসলিম পরিবারগুলিতে বিবাহিত মহিলাদের বিবি বলা হয়, বিধবা হলে বেওয়া। খুব অল্প বয়সেই বেওয়া হয়েছিলেন শিলা, পেটে তখন চার মাসের ভ্রূণ। প্রায় দশক পার করে, এই বছরে এক যুবকের সঙ্গে আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। নতুন স্বামী পরিযায়ী শ্রমিক। কাজ করতে ওড়িশা গেছেন। চারিদিকে বাঙালি মুসলিমদের ধরে ধরে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে, এই খবরে কি ভয় পেয়েছেন তিনি? ‘ওর সঙ্গে কথা হয়, না এখনও কিছু হয়নি ওদিকে। কিন্তু ভয়ে থেকে কি করবো? ভয়, রাত জাগা, কান্না- সব ত্যাগ করেছি বহু বছর। মোবাইলে দেখি, মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিকদের কীভাবে বাংলাদেশে পাঠানো হল। কীভাবে রাত কাটালো তারা অন্ধকারে এক চা বাগানে। মরদকে জিজ্ঞেস করি, বাংলাদেশে পাঠালে কি করবা? বলে, ভয় পাও কেন? আমি নাকি ভয় পাবো? দেখো আমিও চলে যাবো লুকিয়ে।’
‘আমার জীবনে বিবি হওয়া বা বিবি থেকে বেওয়া হওয়া নিজের ইচ্ছায় হয়নি। এখন আবার বিবি হয়েছি, কিন্তু জানা নেই কতদিন……!’
একটি পরিযায়ী গ্রামের বউ
মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার তরতিপুর নামের এই গ্রামটিতে আমরা যখন ঢুকলাম তখন পড়ন্ত বেলা। জুলাই মাসের বর্ষণে গ্রামের রাস্তা পুকুরে পরিণত হয়েছে। মূলত মুসলিম জোলা পরিবারের বসবাস এই গ্রামে। গ্রামের চারিদিকে তাঁত বোনার আওয়াজ। গামছা বোনা হয় এই গ্রামে। ‘বেলডাঙ্গার গামছা’ বলে যা খ্যাত সেই গামছা বেশিরভাগ বোনা হয় হরিহরপাড়ার বিভিন্ন গ্রামগুলিতে।
‘পুরুষরা তো সবাই ‘বিদেশ’-এ, তাঁত বোনেন কারা?’ প্রশ্ন করতেই উত্তর এলো সপাটে, ‘কেন আমরা?’ বাস্তবে গ্রাম কে গ্রাম খালি। মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলি হোক বা সীমান্ত থেকে ১০-১৫ কিলোমিটার দুরের গ্রাম চিত্র একইরকম। পুরুষরা সব কাজ করতে সুদূরে, মেয়েরা ঘরে। তাই তাঁত এখন তারাই বোনেন। ‘মাত্র ১ বছর হল ছেলের বিয়ে দিয়েছি, কিন্তু নসীব এমনই কাজের জন্যে পুনে যেতে হল। বাড়িতে কম বয়সী নতুন বউ, কষ্ট হয় ওর জন্যে’, বলছিলেন ষাটোর্দ্ধ কুলজান বেওয়া। বছর উনিশের কুলসুম বিবি তখন তাঁত বুনছিলেন।
ওই গ্রামেরই ৬-৭ জন মানুষ আটক হয়ে ছিলেন ওড়িশার ঝারসুগদা জেলায়। প্রায় ৭-৮ দিন আটক থাকতে হয় তাঁদের। তারপর ছাড়া পান। পাশের বাড়ির দাওয়ায় বসে আমরা কথা বলছিলাম ফিরে আসা ছয়জন পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে। তাঁদের সেই কদিনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা শুনছিলাম। অদূরেই ছিলেন কুলসুম। তাঁর স্বামী ফিরে আসেননি, না তাঁকে আটক করা হয়েছে এমন নয়। তাঁতঘর থেকে তাঁর উৎসুক আর উদ্বিগ্নতার চাহনি জানান দিচ্ছিল তাঁর বয়ান। কেমন আছেন কুলসুম, আমাদের জানা হয়ে গিয়েছিল।
তরতিপুরের এই ছয়জন শ্রমিকরা আবার ফিরে গেছেন ওড়িশায়। আবার ওখানে কেন যাচ্ছেন জানতে চাইলে সমবেত উত্তর ছিল, ‘কি করবো এখানে? বউ-বাচ্চা নিয়ে না খেতে পেয়ে মরবো নাকি?’
গ্রামের নামে মহুয়ার গন্ধ, স্বামীর নাম নিতে নেই
ঝাড়খণ্ডের দেওঘর জেলার মার্গোমুন্ডা ব্লকের ছোট্ট একটি পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা গ্রাম মহুয়াটাঁড়। মধুপুরের সরকারি হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গ্রামটিতে সিলিকোসিস রুগীর সংখ্যা ১৮। গ্রামের বেশিরভাগ পুরুষ ঠিকাদারের অধীনে কাজ করতে যান চিত্রা কোলিয়ারিতে। দেওঘর জেলার একমাত্র কয়লা খনি, চিত্রা খোলামুখ কয়লা প্রকল্প, সেখানে। অনিয়মিত রোজগার এবং অমানুষিক পরিশ্রমের ফল এই মারণ রোগ। দেওঘরের জেলা হাসপাতালের যক্ষ্মা রোগের বিভাগের দাবি, এই গ্রামের অনেকেই নিরাময়ের দিকে। বাস্তবতা অবশ্য অন্য কথা বলে। এই গ্রামেরই অনিতা সোরেনের কাছে অন্য গল্প পাওয়া গেল। না, তাঁর স্বামীর কোন রোগ হয়নি। কয়লা খনিতেই কাজ করেন তিনি, কিন্তু ভিন রাজ্যে। কোথায়? অবাক করে দিয়েই জবাব পেলাম, ‘পশ্চিমবঙ্গে’। মানে এইখানে ‘উল্টোস্রোত’। পরিযায়ী শ্রমিকের গতিপথ যে রাজ্যে পশ্চিমমুখী সেখানে উল্টোস্রোত কেন?
অনিতার স্বামী রাণীগঞ্জের অবৈধ কয়লা খনিতে লেবারের কাজ করেন। যখন যান তখন একটানা মাস দুয়েক থাকতে হয়। এক মেয়ে ও এক ছেলে অনিতার, বাড়িতে বৃদ্ধ শ্বশুর, বৃদ্ধা শাশুড়ি। শ্বশুর যক্ষ্মা রুগী। ‘খুব আতঙ্কে থাকি জানেন, খাদের মধ্যে ঢুকতে হয়, কখন ধ্বস নেমে আসে! কোন রেকর্ড নেই, নেই কোন প্রমাণ, মরে গেলে ওখানেই থাকবে লাশ, আনাও যাবে না’। একটানা বলে গেলেন অনিতা। ‘খাদের ভিতরে মোবাইল কাজ করে না, কোন খবর পাইনা। টাকা একটু বেশি, তাই যেতে হয়। বাড়িতে এতগুলো পেট, অসুস্থ বাপ। এই রোগে ভালো খাবার যোগাতে হয় যে!’
নিজে কাজ করেন একটি এনজিওতে, মধুপুরে। স্বামী যখন আসেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেন কাজের কথা। স্বামী বলতে চান না। না বললেও, অনিতা বুঝতে পারেন।
হাকিমপুর সীমান্তে
সুপ্রিম কোর্টে দুই সপ্তাহের মধ্যে ‘এত আপত্তি কেন’ থেকে ‘আপত্তি থাকলে ভেবে দেখা যেতে পারে’-এই অবস্থানগত বদল দেখেছি। প্রসঙ্গ এস আই আর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন। নির্বাচন কমিশনের এত তাড়া কিসের? ২০০২ সালের সর্বশেষ এস আই আর শেষ করতে দুই বছর লেগেছিল। আর এবারে ৪ নভেম্বর ২০২৫ বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনুমারেশান করা শুরু থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ পর্যন্ত তিন মাসেরও কম সময়। এত তাড়া কিসের? অবশ্য ৭ দিনের সময় বাড়ানো হল, এই ‘বাস্তব বোধ’ থেকেই।
হাকিমপুরে বাংলাদেশী মানুষের কাতার দেখে খল খল হাসি হাসছে গোদি মিডিয়া। বলছে, ‘এই তো এস আই আরের ফল তো হাতেনাতে পাওয়া গেল।’ হ্যাঁ, ত্রাসে, আতঙ্কে হাকিমপুর বর্ডারে যারা ফিরে যাচ্ছিলেন তাঁরা সকলেই ওপার থেকে আসা মানুষ। ১৯৪৬-এর বিদেশি আইন হোক বা অধুনা কার্যকর হওয়া ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫, আইন অনুযায়ী এরা ‘বিদেশি’। এনারা নির্দ্বিধায় স্বীকার করছেন, ‘আমরা বাংলাদেশী’। বিভিন্ন চ্যানেলে বুম করে দেখানো হচ্ছে তাঁদের। তাঁদের ভয়, আশঙ্কা, হতাশা বিক্রি হচ্ছে। টি আর পি বাড়ছে হু হু করে।
কোহিনূর বেগম, আগের দিন সকালে হাওড়া স্টেশনে এসেছেন ব্যাঙ্গালোর থেকে। এই দেশে আসেন চিকিৎসার জন্যে, ২০২২ সালে। হাকিমপুর চেকপোস্টের অদূরে এক চালার নিচে অস্থায়ী এক বসার জায়গা। সেখানে এসে বসলেন। সকলেই সেখানে এসেই বসছিলেন। বেশ সপ্রতিভ কথা বলছিলেন তিনি। ‘বুকে টিউমার, অনেকে বলে ব্যাঙ্গালোর যেতে। সেখানে সন্তোষ হাসপাতালে দেখানো হয়। খরচ অনেক, কিন্তু আমার কাছে অত পয়সা কোথায়? পাসপোর্ট, ভিসার হ্যাপা কি চাট্টিখানি কথা! তাই দালালের মারফৎ সীমান্ত পার হয়ে এসেছিলাম। এই হাকিমপুর সীমান্ত দিয়েই। বাড়ি বাংলাদেশের যশোর জেলার সারসা থানা এলাকায়। সেই যে এসেছিলাম আর যায়নি’।
কি করতেন সেখানে, থাকতেন কোথায় জানতে চাইলে, তিনি বলেন, ‘কয়েকটা হোটেলে বাসনপত্র পরিষ্কারের কাজ করতাম। থাকতাম পশ্চিমবঙ্গের এক প্রবাসী বাঙালির বাড়িতে’। এতদিন ভালোই ছিলাম, চিকিৎসা, রোজগার দুটোই চলছিল।’ চলে এলেন কেন, জানতে চাইলে কোহিনূর জানান-
১০-১২ দিন আগের কথা, বিজেপির গোটা চারেক গুন্ডা এসে হোটেল মালিককে বলে, ‘বাংলাদেশী থাকলে তাড়িয়ে দাও’। শুনে আমাদের হোটেল মালিক আমাদের বলে চলে যেতে। কয়েকদিন বাদে ওরা আবার আসে, ওদের সঙ্গে পুলিশও আসে। হ্যাঁ, কর্ণাটকে কংগ্রেসের সরকার, কিন্তু আমাদের প্রতি আচরণে সকলেই এক।
‘আমাদের তো বাংলা ভাষা। তা সে কোলকাতার হোক আর বাংলাদেশের। নিজেদের মধ্যে দেখা হলেই আমরা তো বাংলা ভাষাতেই কথা বলি নাকি? ওরা বাঙলা শুনলেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে ধরছে। পশ্চিমবাংলার মানুষদেরও ধরছে।’
‘প্রথমে ফোন সেট নিয়ে নেয়, তারপর সেখানে থাকা নাম্বার সার্চ করে। বাংলাদেশের নাম্বারটা যখন দেখে মোবাইলে তখনই ধরা পড়ে যাই। আপনি যে মিথ্যা কথা বলবেন, তা হবে না। ধরা পড়ে যাবেন। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, আর ওখানে কানাড়া ভাষা।’
‘আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে গেছে। বাড়িতে বুড়ো বাবা, বুড়ি মা। ওদের কাছেই ফিরে যাচ্ছি। ওখানে ফিরে গেলে চিকিৎসা হবে না, ওখানে রোজগার নেই। কিন্তু কিছু তো আর করার নেই!’
কোহিনূর বেগমের আপাত-সপ্রতিভতার ভিতরে লুকিয়ে ছিল তীব্র আশঙ্কা। একটা ডোন্টকেয়ার ভাব ছিল তাঁর মধ্যে। এই ক’বছরে বিভিন্ন প্রতিকূলতা তাঁকে বদলে দিয়েছে। অবৈধ উপায়ে সীমান্ত পেরিয়ে আসা, ভিন দেশে, ভিন ভাষী রাজ্যে থাকা, অসুস্থতা- এইসব কিছু একা এক নারীকে ইস্পাত কঠিন করে তুলেছে। তিনি যখন কথা বলছিলেন তখন পাশ থেকে একজন স্থানীয় ব্যক্তি তির্যক মন্তব্য ছুড়ে দেয়, ‘আপনি তো অনেক কিছুই জানেন দেখছি, ওখানেই তো থাকতে পারতেন’। উত্তরে ম্লান হাসি হেঁসে কোহিনূর বলেন, ‘মিথ্যা বলবো না, মায়া পড়ে গেছিল এই দেশের প্রতি, কিন্তু এখানেও ঠাই হল কোথায়?’
কেন চেয়ে আছো গো মা
মা শুধু চেয়ে থাকে পথের পানে, কখন তার দুই সন্তান ফিরবে। কখন আবার মা বলে ডাকবে। চিরকালীন মা ও তার সন্তানের মেলোডি নয়, আজকের কঠিন বাস্তবতা। বাংলার গ্রাম কে গ্রাম খালি করে যুবক ও সদ্য যুবকেরা ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। কারণ রোজগার নেই এই রাজ্যে। বাড়ির মানুষ অপেক্ষা করে থাকে ছেলে বা দাদা বা স্বামীর ফিরে আসার। আসে যখন সুখ নিয়ে আসে, অর্থ নিয়ে আসে। বাইরের রাজ্য থেকে নিয়ে আসা রোজগার থেকে হয় সমৃদ্ধি।
নদীয়ার রানাঘাট থানার অধীনে নোকরি গ্রাম পঞ্চায়েত। গ্রামের নাম নবরায়নগর। গাছপালায় ঘেরা এক গ্রাম। গ্রামের মাঠপাড়ায় টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা এক-ঘরের এক বাড়ি। ঘরের দরজায় সামান্য হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন উনি। বৃদ্ধ স্বামী মাঠে কাজ করতে গেছেন, দিনমজুরের কাজ। রোপণের এই মরসুমে চাষের কাজ পাওয়া যায়। মজুরি অল্পই, কিন্তু উপায় কি? বাড়িতে রান্না এখনও চাপেনি, সূর্য মধ্য গগনে। এর মধ্যে দুইবার স্ট্রোক হয়েছে। দ্বিতীয়বার হয়েছে দুই ছেলের গ্রেফতারের খবর পাওয়ার পর। পুস্পা বিশ্বাস, এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, তার দুই ছেলে বিনা অপরাধে কেন জেলের কুঠরিতে বন্দী!
নিশিকান্তের বয়স হয়েছে, দূরের মাঠে জন খাটতে যেতে পারেন না। তাই গ্রামের মধ্যেই কাজ পেলে করেন, মজুরি কম হলেও করেন। মা-বাপ আর দুই ছেলের ছোট সংসার। সংসারটা একটু গুছিয়ে নিচ্ছিলেন ওরা। দুই ছেলে, মনিশঙ্কর আর নির্মল কাঠের কাজ জানে, সেই কাজের সূত্রেই তাঁদের ভিন রাজ্যে পাড়ি। আগে দিনাজপুরে থাকতেন, বছর চারেক হল তাঁদের নদীয়ায় আসা। কাঠাখানেক জায়গা কিনে কোনরকমে একটা ঘর তুলেছেন, টিন দিয়ে ঘেরা।
মনিশঙ্করের বয়স ২৩, আর নির্মলের ২২। ‘বিদেশী’ সন্দেহে দুই ভাইকে মহারাষ্ট্রের আকোলা থেকে গত ২৪ ডিসেম্বরে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, পাসপোর্ট আইন এবং বিদেশী আইনে গ্রেফতার করা হয়। খবর শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েন মা, পুস্পা বিশ্বাস। সংবাদে প্রকাশ, ‘ঘটনার অভিঘাতে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত’।
‘ছেলে দুটোর তো ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সবই আছে। মতুয়া কার্ড আছে। মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের ইস্যু করা মতুয়া কার্ড’ জানালেন এক প্রতিবেশী । নিশিকান্ত বলছিলেন, আমরা মহারাষ্ট্রে গিয়ে ছেলেদের সাথে দেখা করতে পারিনি, আমাদের সামর্থ্য কোথায়? মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের কাছে গিয়েছিলাম, বললেন দেখছি। আজ এত মাস হয়ে গেল, উনি আর কতদিন দেখবেন?
হ্যাঁ, দেখার দিনলিপি বাড়তে থাকে ক্রমশ। সংঘর্ষ ও ক্রোধের বর্ধিত উপনিবেশে অনিতা সোরেন বা কোহিনূর বেগম এক কাতারে দাঁড়িয়ে থাকে। দিন যায়, দিন আসে। লড়াই চলতে থাকে। স্বামীর খাদে ঢোকা বা না ঢোকা, বিবি হওয়া বা বেওয়া হওয়া এখানে যেন ‘স্বাভাবিক’। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ অমিতের সঙ্গে কেতকির সম্পর্ককে ‘তোলা জল’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। প্রতিদিন তুলবে, প্রতিদিন ব্যবহার করবে,এমনই সহজ ও স্বাভাবিক। প্রায় প্রতিদিন মৃত্যু বা উদ্বাস্তু হওয়ার বিপন্নতা নিয়ে থাকা এই মানুষগুলোর কাছে বিপন্নতা তেমনই সহজ ও স্বাভাবিক। কে আর ওসবের পরোয়া করে, এমনই বেপরোয়া বোধ বা নির্লিপ্তি!
সূত্র-
২।
পরিযায়ী শ্রমিকের কথা, শুভ প্রতিম, রূপান্তরের পথে, মালদহ, ২৪ আগস্ট, ২০২৫
৩।
বিশ্বাস করেন আমার বাড়ি মুর্শিদাবাদ, শুভ প্রতিম রায় চৌধুরী, আমি ভারতীয়, ঝড়, বহরমপুর, ১৮ আগস্ট, ২০২৫
৪।
When ‘Janaganamana’ could not save me: Expelled, beaten and humiliated: Stories of Bengali Migrant Workers by Subha Protim Roy Chowdhury, Frontier Web, August, 2025
লেখক : মানবাধিকার কর্মী ও প্রাবন্ধিক
ছবি (শিলা বিবি যখন শিলা বেওয়া হলেন) : সংগৃহীত
0 Comments
Post Comment