- 23 April, 2026
- 0 Comment(s)
- 91 view(s)
- লিখেছেন : সাবনূর সনম কামিনী
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ইস্যু নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশেই সংখ্যালঘু নিপীড়ন আর কেবল বিচ্ছিন্ন সামাজিক ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; তা পরিণত হয়েছে আমাদের প্রাত্যহিক যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। রাষ্ট্রভেদে সংখ্যালঘুর পরিচয় আলাদা—ভারতে মুসলিম, খ্রিস্টান,শিখ ও দলিতরা যেমন সংখ্যালঘু বা প্রান্তিকতার শিকার, বাংলাদেশে তেমনি হিন্দু জনগোষ্ঠী। কিন্তু নিপীড়নের চরিত্র, রাষ্ট্রীয় সমর্থন ও উদাসীনতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদের দাপট—দুই দেশেই আশ্চর্যরকম অভিন্ন। ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই সংখ্যালঘুদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তারা দেশের শত্রু। রাষ্ট্র কর্তৃক এই একধরণের "অপর" নির্মাণের যাঁতাকলে পড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হয়ে যায় নিজ ভূমে পরবাসী। আর নিজের দেশে তাদের প্রতি পুঞ্জীভূত হয় ঘনীভূত বিদ্বেষ। এই সংখ্যালঘু বিদ্বেষ কখনও কোনো নিরীহ হিন্দু যুবককে “দেশদ্রোহী” বানিয়ে আগুনে ঝলসে দিতে পারে আবার, তা কখনো কোনো মুসলিম শ্রমিককে "জয় শ্রীরাম" না বলার অপরাধে 'সন্ত্রাসবাদী' বানিয়ে হিংস্র আক্রমণের মুখে ফেলতে পারে। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও বাংলাদেশে বেশ জমজমাট চলছে সংখ্যালঘু নিধন প্রতিযোগিতা। তবে সংখ্যালঘু- নির্যাতনের ইস্যুটি হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়েছে এমনটা নয়,বরং তা দীর্ঘদিনের সামাজিক বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক মেরুকরণের ফল। সংখ্যাগরিষ্ঠতার আবেগকে উসকে দিয়ে ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করা, ইতিহাসকে বিকৃত করে ঘৃণা-বিদ্বেষের ভাষ্য তৈরি করা, সামাজিক মাধ্যমে পরিকল্পিত বিদ্বেষ ছড়ানো—এই সবকিছু মিলিয়ে অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে এবং সম্প্রতি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ডামাডোল সংখ্যালঘু-নিধন যজ্ঞের অগ্নিতে বাড়তি ঘৃতাহুতি করলো। প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সংখ্যালঘু বিদ্বেষের ভাষ্য দুই দেশেই একই ছাঁচে নির্মিত। এই সংখ্যালঘু নিপীড়ন কেবল সামাজিক বিদ্বেষের ফল নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্র-সমর্থিত কাঠামোগত সহিংসতা। তবে যখন উদার-মনস্ক, রবীন্দ্র -নজরুল সংস্কৃতির ধারক ও বাহক সুশীল সমাজের বিচক্ষণ অন্তর্মহলেও রাষ্ট্র নির্মিত সংখ্যালঘু বিদ্বেষ জাঁকিয়ে বসে বা তাঁরাও যখন এই কাঠামোগত হিংসার কুশী-লব হয়ে ওঠেন তখন সেটা আরও বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে।
এখন ভারতে "বাঙালি" বা "বাংলাদেশি" ইস্যু নিয়ে ঘৃণা -বিদ্বেষের আবহ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিককে বাইরের রাজ্যে গিয়ে হেনস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তাদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, অনেকেই এই বিদ্বেষের বলি হচ্ছেন- এইসব খবর পড়ে ভারাক্রান্ত, উদ্বিগ্ন মনে যখন নিজেকে সান্ত্বনা দিই যে "ভয় কি তোর নিজের রাজ্যে!" ঠিক তখনই একটা রূঢ় বাস্তব আমার এই মেকি সান্ত্বনাকে ধূলিসাৎ করে দিলো। এখন মনে হচ্ছে সত্যিই বোধহয় নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে উঠলাম, একটু খোলসা করে বলা যাক......।এক পান্ডব বর্জিত অজ পাড়া গাঁ থেকে উচ্চশিক্ষার সূত্রে তিলোত্তমা কলকাতা শহরে আগমন। সম্প্রতি একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে গিয়ে নিজ দেশে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হলাম,যা খুবই ভয়ানক যন্ত্রণাদায়ক। আস্তানা খুঁজতে ইতিমধ্যে পঞ্চাশটিরও বেশি বাড়ির দুয়ারে কড়া নাড়া হয়েছে, ব্রোকারদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। সবজায়গাতেই আমার "ধর্ম পরিচিতি" জানার পর তাদের মুখে ফুটে উঠলো একরাশ ঘৃণার অভিব্যক্তি। কোথাও শুনতে হলো “মুসলমানকে আমরা ঘর দিই না”, আবার কোথাও সরাসরি ঘৃণা-যুক্ত ভাষিক -আক্রমন। এমনকি কিছু 'ইসলামোফোবিক' ভদ্রলোক শ্রেণীর বাড়ি-মালিকগণ নিজেদের মধ্যেকার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ওগরানোর সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গেলেন আমাকে সামনে পেয়ে। একজন বাড়ি মালিক ভদ্রলোক চমৎকারভাবে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন "মুসলমান" ও "সন্ত্রাসবাদ" দুটোই সমার্থক শব্দ। একজন "রবীন্দ্রভক্ত- "বুদ্ধিজীবী" ভদ্রলোক বাড়ি-মালিক নাক শিটকে বললেন "তোমার নামটা শুনে কেমন 'বাংলাদেশী' মনে হচ্ছে...!" এক বাড়ি মালিক ভদ্রমহিলা উদারচিত্তে বললেন : "ধর্ম নিয়ে আমার বাছ-বিচার নেই, কিন্তু পাড়ার লোক যদি জানতে পারেন মুসলমানকে ঘরভাড়া দিয়েছি, তাহলে একঘরে হয়ে যাবো"! এর সাথে তাঁর সংযোজন "ফ্যামিলি"কে ঘরভাড়া দেন, "ব্যাচেলর মেয়েদের" একা একা ঘরভাড়া দেন না।"এখানে আবার দ্বৈত সমস্যা!!
তিলোত্তমা কলকাতা—যে শহর বরাবরই উদার, আধুনিক আর বিভিন্ন সংস্কৃতির সহাবস্থানের প্রতীক বলে পরিচিত, যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই রবি ঠাকুরের আরাধনা করেন ,সেই শহরের বুকেই আমি প্রথমবার নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুভব করলাম—ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অব্যক্ত যন্ত্রণা। বর্তমান "বাংলাদেশী" ইস্যুকে কেন্দ্র করে যে ভয়ের রাজনীতি, যে ঘৃণা-বিদ্বেষের ভাষ্য চারিদিকে ডালপালা মেলেছে,তা নির্বিঘ্নে ঢুকে পড়েছে এই আধুনিক শহরের কিছু বুদ্ধিজীবী ভদ্রলোক শ্রেণীর উদার মগজে, এবং 'শিক্ষিত','আধুনিক', প্রগতিশীল বাড়ি-ওয়ালার রবীন্দ্র-নজরুল ছবি শোভিত ঝাঁ চকচকে ড্রয়িংরুমেও। একদল 'বিশুদ্ধ ভারতীয়' যাঁরা কেউ রবীন্দ্র -অনুরাগী,কেউ বুদ্ধিজীবী, অর্থাৎ সোজা কথায় ভদ্রসমাজের সদস্য -সবার কাছ আমি প্রতিভাত হলাম "বাংলাদেশী","মুসলমান" বা "সন্ত্রাসবাদী" হিসেবে। আমি তাদের উগ্র-জাতীয়তাবাদী দম্ভের সামনে প্রমাণ করতে পারলাম না আমি আপাদমস্তক নিখাদ খাটি ভারতীয়, আমার আত্মা -পরমাত্মা,অস্থি -মজ্জা সর্বত্রই আমার একটাই আত্মপরিচিতি আমি ভারতীয়,আমার চোদ্দো পুরুষের নশ্বর দেহ ভারতের পঞ্চভূতেই মিশে আছে....! শুধুমাত্র সংখ্যালঘু ধর্মীয় পরিচিতির কারণে একটি আস্তানা খুঁজতে গিয়ে রীতিমতো হেনস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, এটা শুধুমাত্র আমার নিজের একটা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এই অভিজ্ঞতা প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে অতীব স্বাভাবিক একটি দৈনন্দিন ঘটনায় পর্যবসিত।
গণতন্ত্রের একটি বড় বিপদ হলো ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ’। যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, ধর্ম বা রাজনৈতিক মতাদর্শকে জাতীয় পরিচয় হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সংখ্যালঘুরা পরিণত হয় ‘অপর' বা ‘বহিরাগত’ গোষ্ঠীতে। ফলস্বরূপ, সংখ্যালঘুদের ওপর সামাজিক বয়কট, এমনকি শারীরিক সহিংসতাও “জনমতের” নামে বৈধতা পেতে থাকে। এখানেই গণতন্ত্রের একটি গভীর স্ব-বিরোধ প্রকাশ পায়। যে শাসনব্যবস্থা সাম্য, স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবাধিকারের কথা বলে, সেই ব্যবস্থার মধ্যেই যদি সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তবে প্রশ্ন ওঠে—এই গণতন্ত্র কার জন্য? শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য? তাহলে গালভরা শব্দ গণতন্ত্রের পরিবর্তে সোজাসুজি 'সংখ্যাগরিষ্ঠ-তন্ত্র' বলাই শ্রেয়! আর ভারতের সংবিধানে "ধর্মনিরপেক্ষতা" শব্দটির অহেতুক প্রাণহীন নিথর উপস্থিতি বড়ো হৃদয়বিদারক, "ধর্মনিরপেক্ষতা" নামক মৃত শব্দটির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা হোক। বর্তমানে রাষ্ট্রের কাছে মানুষের জীবনের চেয়েও "পরিচয়ের রাজনীতি" অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই এখন মৃত্যু উপত্যকার বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে ভারত ও বাংলাদেশ নির্লজ্জভাবে একে অপরের দিকে আঙুল তুলে সংখ্যালঘু নিপীড়নের অভিযোগ করছে। কিন্তু এই পারস্পরিক কাঁদা ছোড়াছুড়ির অবকাশে অপ্রাসঙ্গিক থেকেই যাচ্ছে সংখ্যালঘুদের মানবাধিকারের বিষয়টি। সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সংখ্যালঘুদের একার দায়িত্ব নয়। এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের নৈতিকতা বা মানবিকতার পরীক্ষাও বটে। আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনা—দুই প্রতিবেশী দেশের এবং সেই সুশীল সমাজের, যারা নীরব থেকে বা ঘৃণা-ভাষণ দিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বিদ্বেষকে স্বাভাবিক করে তুলছে।
লেখক: গবেষক, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: সংগৃহীত
0 Comments
Post Comment