- 04 November, 2026
- 0 Comment(s)
- 36 view(s)
- লিখেছেন : মীরা কাজী
“ওই আবার বৃষ্টিটা এসে গেল!” শরতকাল এলে এই এক জ্বালা অম্বালিকার। বার বার কাপড়-চোপোড় তোলা, মেঘ সরে গেলে ফের সেগুলোকে রোদে দেওয়া। বারান্দার দড়িতে মেলে দিলে দিব্যি শুকিয়ে যাবে, কিন্তু রোদে না শুকোলে অম্বালিকার মন খুঁত খুঁত করে। মনে হয়- স্যাঁত স্যাঁতে একটা গন্ধ যেন কাপড়ের গায়ে লেগে আছে। আধ শুকনো কাপড়গুলো ছাদের দড়ি থেকে ছোঁ মেরে তুলে থেমে থেমে সিঁড়ি ভাঙে অম্বালিকা। হাঁটুর ব্যথার জন্য সিঁড়ি ভাঙতে আজকাল কষ্ট হয় অথচ কিছুদিন আগেই কারণে অকারণে কতবার ছাদে আসত। তার ওপর শুরু হয়েছে মাইগ্রেনের সমস্যা। ওষুধেও সারছে না। ডাক্তারবাবুর নির্দেশ মতো বিকেলের দিকটায় একটু খোলা হাওয়ায় হাঁটাহাঁটিও শুরু করেছে।
হাঁটাহাঁটির কথা মনে হতেই একটা উষ্ণ স্রোত চলকে ওঠে অম্বালিকার বুকের ভেতর।
“যাঃ! বৃষ্টির ছাটে সব -----!“ কাপড় গুলো বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে জানালা বন্ধ করতে ছোটে অম্বালিকা। এ ঘর ওঘর ছোটাছুটি করে জানালা গুলো বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।
পুবের বারান্দাটা বড় প্রিয় অম্বালিকার। এখানে দাঁড়ালে মনটা ভালো হয়ে যায়। সামনে খোলা উঠোন। নীচু পাঁচিল টপকে গেরোস্তালির ঘেরাটোপে আটকে থাকা দৃষ্টিটা হঠাৎ ক’রে মুক্তি পেয়ে যায়। মন হু হু করা দুপুরে, কিম্বা কোনও ঘুম না আসা রাতে এখানে এসে দাঁড়ায় সে। দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের হুইসেলের আওয়াজ অন্য এক জগতে পৌঁছে দেয় অম্বালিকাকে।
এ দিককার উঠোনটা অনেকদিন পরিষ্কার করানো হয়নি। ঘাসে, আগাছায় একটা জঙ্গুলে ভাব। এবার পরিষ্কার না করালেই নয়। প্রত্যেক বার এখানে গাঁদা আর জিনিয়ার চারা বসানো হয়। কিছুটা জায়গা ফাঁকাই পড়ে থাকে। ফাঁকা জায়গাটায় এবার ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, কিছু পপির চারা বসাবার কথা ভাবে অম্বালিকা। আহেলি দেখলে খুশি হবে। মেয়ের খুশি খুশি মুখখানা মনে করে অম্বালিকার মনটাও খুশি হয়ে ওঠে। সে খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।
গতকাল সকালের পর আর ফোন করেনি আহেলি। পরীক্ষা তো কী হয়েছে, বাড়িতে একটা ফোন করা যায় না? বাড়ি থেকে বার বার ফোন গেলেও বিরক্ত হয়, বলে, ” আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে, আমাকে নিয়ে অকারণ চিন্তা করাটা এবার ছাড়।”
হস্টেলে যাবার পর মেয়েটার কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাব। মাকে ছাড়া যার এক দণ্ড চলতো না, সে এখন মাকে ফোন করতে ভুলে যায়। মায়ের হাতের রান্না ছাড়া যার মুখে রুচতো না, হস্টেলের খাবারে সে এখন বেশ অভ্যস্ত। তার প্রিয় পদগুলো রান্না করে মুখের সামনে দিলে আগের মতো তৃপ্তির আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে না। ‘কেমন হয়েছে’ জিজ্ঞেস করলে ‘ঠিকই তো আছে’ এমনই দায়সারা গোছের উত্তর দেয়।
মেয়েকে নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা অহরহ ঘুরপাক খায় অম্বালিকার মনে। অথচ কিছু বলাও যায় না। যা দিনকাল! না চাইতেই একটা নিশ্বাস ঝরে পড়ে বুক খালি করে।
হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূরে চলে যেতে ভালো লাগে অম্বালিকার। চেনা মানুষ জন, চেনা পরিবেশ ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূরে। ‘বাঁকুড়া বর্ধমান রোড’- যেটা বাঁকুড়া থেকে শুরু হয়ে পাশে পড়ে থাকা বহু গ্রাম,শহর,প্রান্তরের সাথে ‘বুড়ি ছোঁওয়া ছুঁয়ি’ খেলা করতে করতে,অম্বালিকাদের মফস্বলটাকেও একবার ছুঁয়ে দিয়েই “কৃষকসেতু”র দিকে উধাও হয়ে গেছে, সেই রাস্তাটার দু’পাশে আকাশ মনি, সোনাঝুরি, ইউক্যালিপ্টাস গাছের সারি। পড়ন্ত বিকেলে সেখানে ঝিরঝিরে হাওয়া আর জাফরি কাটা রোদের লুকোচুরি। গাছে গাছে নীড়ে ফেরা পাখিদের কল- কাকলি। এদিকটায় এলে নিবিড় প্রশান্তিতে মন ভ’রে ওঠে।
অপেক্ষাকৃত ছায়াবহুল একটা গাছের তলায় ছবি আঁকার সরঞ্জাম সাজিয়ে এক ভদ্রলোক নিবিষ্ট মনে কিছু আঁকেন। মাঝে -মধ্যে চোখে পড়ে অম্বালিকার। ইদানীং টুকটাক কথাবার্তা হয়-ওই কুশল বিনিময় গোছের।
ফোনটা বাজছে? কার ফোন? আহেলির? দিব্যেন্দুও হতে পারে।
“ হ্যালো দিদি?” – “হ্যাঁ , সব ভালো” - “আহেলি হস্টেলে, দিব্যেন্দু ব্যবসার কাজে কানপুর গেছে ” -- “যাওয়ার জন্য অনেক ক’রে বলেছিল, আমিই গেলাম না.” -- “ আজ হবে না, একটু কাজ আছে" -- “সামনে সপ্তাহে ঠিক যাব।" “ঠিক আছে, রাখ।“
আজকাল কোনও কিছুই যেন ভালো লাগে না অম্বালিকার। কোনও আত্মীয় স্বজনের বাড়ি যেতেও মন চায় না। কেনা কাটার ব্যাপারে দিব্যেন্দুর দরাজ হাত। একটা বললে দশটা হাজির করে দেবে। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনও কিছু কেনার তাগিদটাই যেন হারিয়ে গেছে। প্রয়োজনের গণ্ডিটাও ক্রমশ যেন ছোট হয়ে যাচ্ছে। একটা অস্থিরতা সর্বক্ষণ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। অথচ কেন এমন হচ্ছে তার কোন ও ব্যাখ্যা নেই তার কাছে। সামান্য সামান্য ঘটনা অম্বালিকাকে এতটাই অভিভূত করে ফেলে তার থেকে সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না। মনের ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে সেই সামান্য ঘটনাই ক্রমশ জটিল হয়ে তার সমস্ত সত্তাকে গ্রাস করে ফেলে।
অম্বালিকার ছোটখাটো শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না দিব্যেন্দু । দিব্যেন্দুর এই উদ্বেগ সহজে মেনে নিতে পারে না অম্বালিকা। মনে হয়, দিব্যেন্দু তাকে করুণা করছে। তার আর দিব্যেন্দুর কিছু কথোপকথন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে থাকে অম্বালিকা।
দু’দিন আগের সকালের কথা-
” তোমার মাথা ধরা কমেছে?” অম্বালিকাকে তখনও শুয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে দিব্যেন্দু। এর মধ্যে একপ্রস্থ হাঁটা শেষ করে স্নান সারা হয়ে গেছে তার।
“কমে যাবে।"
“আমি ডঃ মিত্রর চেম্বারে নামটা লিখিয়ে দিয়ে যাব, তুমি গিয়ে দেখিয়ে এস।"
“ আজ থাক, যদি না কমে তখন না হয় যাব।"
“ খামোকা কষ্ট পেতে যাবে কেন? আজই যেও।"
“ আবার গুচ্ছের ওষুধ! ভাল্লাগে না!”
“ ওষুধ কেউ শখ করে খায় না। অসুখ-বিসুখ করলে তো খেতেই হবে।”
“ তুমি তো কয়েকদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছ, ভাবছি তোমার সঙ্গে চলে যাই। অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয়নি।"
“ওখানে আমি কী বেড়াতে যাচ্ছি?”
“কেন? আগেও তো কতবার গেছি। আহেলির পড়ার ক্ষতি হবে ভেবে আমিই যেতে চাইতাম না, তুমিই জোরজার করে নিয়ে যেতে।"
“এখন আমার কাজটা আগের মতো নয়। বিভিন্ন জায়গায় ছুটোছুটি করতে হয়। তোমাকে একটুও সময় দিতে পারব না। আহেলিও থাকবে না। তুমি একা একা কী করবে? তাছাড়া তোমার শরীরও ঠিক যাচ্ছে না।"
“ ও রকম একটু আধটু শরীর খারাপ কার না হয়?”
“ এবার কাজের চাপ একটু বেশি। পরের বার দেখা যাবে। এখন যা বলছি শোনো, ডাক্তারটা দেখিয়ে নাও। দিদির বাড়ি থেকে ঘুরে এলেও পারো, অনেক দিন তো যাওনি।"
অম্বালিকাকে চুপ করে থাকতে দেখে দিব্যেন্দু ফের বলে, ” ইচ্ছে না হলে দিদির বাড়ি যেও না। তবে ডাক্তারটা দেখিও।"
“ বললাম তো কয়েকটা দিন দেখি। হয়তো এমনিতেই সেরে যাবে।”
“ এই বয়সে ট্রিটমেন্ট ছাড়া রোগ সারে না। বোঝো না কেন?”
দিব্যেন্দু আজকাল এভাবেই কথা বলে। বয়স যেন একা অম্বালিকারই বাড়ছে। আচ্ছা,বয়সটা কি অম্বালিকাকে ছুঁয়ে ফেলেছে? জীবনের রূপ-রস মুছে যাচ্ছে অম্বালিকার জীবন থেকে? অথচ তার থেকে কয়েক বছরের বড় দিব্যেন্দু বেশ আছে- নিজের কাজ, অফিস ট্যুর, বন্ধু- বান্ধবের সাথে আড্ডা এসব নিয়ে। যুবক যুবক ভাবটা এখনও সেঁটে আছে শরীর সচেতন দিব্যেন্দুর চেহারায়। হয়তো বা মনেও। আহেলি মাঝে মাঝে মজা করে বলে, ” বাবাকে দ্যাখো এখনও কত এ্যাকটিভ! আর তুমি যেন দিনকে যেন বুড়িয়ে যাচ্ছ!”
আজ সকাল থেকে মেঘের মুখ ভার। থেকে থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। এক কাপ চা নিয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারটায় বসে অম্বালিকা। ‘দেশ’ টা তো আজই দেবার কথা। দিলনা কেন? সামনের টেবিল থেকে পুরোনো পত্রিকাটা তুলে নিয়ে পাতা ওল্টাতে থাকে।
ভদ্রলোককে বাড়িতে না আসতে বললেই বোধ হয় ভালো হতো, দিব্যেন্দু বাড়িতে নেই। দিব্যেন্দু যে থাকবে না এটা তো জানাই ছিল। মনে মনে এটাই কী চেয়েছিল অম্বালিকা? সপ্রতিভ দিব্যেন্দুর প্রবল ব্যক্তিত্বের পাশে চিরকালই কেমন যেন মিইয়ে থাকে সে। সদ্য পরিচিত মানুষটির কাছে নিজের এই মালিন্যটুকু প্রকাশ করতে কোথাও কি বেধেছিল অম্বালিকার? দিব্যেন্দুর অনুপস্থিতিতে কতজনই তো আসে কারণে অকারণে। কই কখনও তো এসব নিয়ে ভাবেনি? নিজের ভাবনাকে জোর করে সংযত করে অম্বালিকা।
বৃষ্টিটা ধ’রে এসেছে। গাছের মাথায় মাথায় বিকেলের রোদের ঝিলিমিলি- চিকন পাতায় যেন গলানো সোনা। এতক্ষণ যারা গাছের ঘন পাতার আড়ালে পালক বাঁচিয়ে বসেছিল, একে একে তারা ভিন্ন ভিন্ন আওয়াজ করতে করতে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। দুটো শালিক পালক ঝেড়ে মাথা ঝুঁকিয়ে আওয়াজ করে নিজেদের ফুর্তি জানান দিচ্ছে।
“ আমার পাঁচটা কিন্তু ঠিক পাঁচটাতেই বাজে!” কথাটা মনের ভেতর চমকে উঠতেই যেন কিছুটা মেঘ ভাঙা রোদ এসে ছড়িয়ে পড়ে অম্বালিকার চোখে-মুখে। “দ্যাখা যাবে!” শব্দ দুটো কথার পিঠে কথার মতো অম্বালিকার অজান্তেই তার ঠোঁটে গড়িয়ে পড়ে। নিজের পোশাকের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে উঠে পড়ে সে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চিরুনিটা হাতে তুলে নেয়। কপালের চুল কিছুটা উঠে গিয়ে কপালটা বড় দেখাচ্ছে। চোখের কোলে বয়সের ছাপ। ছিপছিপে শরীরটা কিছুটা ভারীর দিকে। তবুও কি একটা আলগা শ্রী লেগে আছে অম্বালিকার চেহারায়? যৌবন যাই যাই করেও কি থমকে আছে এখনও? অনেকদিন কোনও ভালো শাড়ি কেনা হয়নি। হালকা গয়নাগুলো আলমারিতে পচছে, সেগুলো দিব্যি পরে থাকা যায়। পরনের শাড়িটাকে ফের গুছিয়ে পরে, পাউডারের পাফটা মুখে আলতো করে বুলিয়ে ,খয়েরি রঙের একটা টিপ দুই ভুরুর মাঝখানে সযত্নে সাজায় অম্বালিকা।
“একটুকু ছোঁওয়া লাগে একটুকু কথা শুনি--- তাই দিয়ে মনে মনে ---! “ ছাদের আলসের ধারে দাঁড়িয়ে গুনগুনিয়ে ওঠে অম্বালিকা।
সেদিন হাঁটতে বেরিয়ে একই গাছের নীচে শিল্পী ভদ্রলোককে দেখতে পায় অম্বালিকা। কাছাকাছি হতেই ছবিটার দিকে চোখ পড়ে। একের পর এক তুলির টানে ফুটে উঠছে – দু’পাশে সবুজ গাছের সারি নিয়ে গড়িয়ে চলা একটা রাস্তা। রঙ তুলির সুচারু বিন্যাসে বহুবার দেখার অভ্যাসে পুরোনো হয়ে যাওয়া রাস্তাটা ধীরে ধীরে নতুন হয়ে উঠছে।
“অপূর্ব! “
“ কিছু বললেন?”
“ কী বলব বুঝে উঠতে পারছি না।"
“ মন্দ বললেও কিছু মনে করব না”।
“ এত সুন্দর এঁকেছেন, রাস্তাটকে চেনাই যাচ্ছে না।"
“ রাস্তাটা বাস্তবিকই সুন্দর। আমি শুধু আমার ক্যানভাসে ওকে তোলার চেষ্টা করেছি। কতটা পেরেছি জানি না। রাস্তাটাকে ভালো করে কোনওদিন দেখেননি তাই অমন মনে হচ্ছে।"
“আসলে তাই হয়, যাকে আমরা বার বার দেখি তার সৌন্দর্য আমাদের চোখে তেমন ভাবে ধরা পড়ে না- নান্দনিকতাও সাদামাটা, সাধারণ হয়ে ওঠে। যাদের দেখার চোখ আছে তারা ঠিকই দেখতে পায়।"
“তাই!” ছবিতে তুলি বোলাতে বোলাতে বলেন ভদ্রলোক।
“সত্যিই তাই! দুপাশে ধুতরো, আকন্দের ঝোপ আর বড় বড় গাছের সারি নিয়ে গড়িয়ে চলা এই রাস্তাটায় কত মানুষই তো যাতায়াত করে, আমিও করি, কিন্তু আপনার মতো করে কে আর দেখেছে? আপনার ছবিটা দেখার পর রাস্তাটার দিকে তকিয়ে মনে হচ্ছে- ‘এই রাস্তা ধ’রে বরাবর হেঁটে গেলে পৌঁছে যাওয়া যাবে পৃথিবীর শেষ কিনারায়, এমন এক গন্তব্যে যেখানে সব যাত্রাই পরিণতি পায়’।" অম্বালিকাকে যেন কাব্যিক ভাষায় পেয়ে বসে।
“আপনি খুব সুন্দর কথা বলেন। কথা শেষ হলেও মনের মধ্যে তার রেশটুকু থেকে যায়।"
“ শেষের বাক্যটা কোথায় যেন পড়েছিলাম, মনে এসে গেল ।"
“সে যাই হোক, কারও কথা বলার ধরনে বার বার শোনা কথাও শ্রুতি মধুর হয়ে ওঠে। তখন সেগুলো যেন শুধু কথা নয়, কবিতার পংক্তি হয়ে ওঠে।"
“ আপনি খুব বাড়িয়ে কথা বলেন।"
“ কেন, আমি ছাড়া একথা আপনাকে কেউ বলেনি?”
“ বাদ দিন তো? একদিন আসুন না আমার বাড়ি?" প্রসঙ্গ ঘোরাতে ব্যস্ত হয় অম্বালিকা।
“ আবার বাড়ি কেন? এখানেই তো বেশ ভালো।"
“ আপনার আঁকা কিছু ছবি আনবেন, দেখা যাবে। সেই সাথে গল্পও করা যাবে।"
“গল্প যে কত করবেন জানা আছে। গল্প করার নাম করে ডেকে নিয়ে গিয়ে পতি দেবতাটির হাতে আমাকে গছিয়ে দেবেন। তারপর, চা-জলখবার বানানোর অজুহাতে নিজে রান্না ঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন, এই তো?”
“অভিজ্ঞতা আছে মনে হচ্ছে?”
“ঠকে শেখা ম্যাডাম! ন্যাড়া অনেকবার বেলতলায় গেছে কি না?”
মনের ভেতর এতক্ষণ ধরে রিন রিন করে বাজতে থাকা সলজ্জ হাসিটা সশব্দে ছড়িয়ে দিয়ে ভার মুক্ত হয় অম্বালিকা।
কলিংবেলটা বাজছে? হ্যাঁ তো! চিন্তার সুতোটা ছিঁড়ে যেতেই তরতর করে সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামে অম্বালিকা। রাস্তার দিকের দরজাটা খুলতে খুলতে কিশোরীর উচ্ছ্বলতায় বলে ওঠে, ”এলেন যাহোক! আমি ভাবলাম বুঝি আর ---!”
“কাকীমা! আহেলি এসেছে?"
“কই না তো?”
“ ফোনে বলল যে আসবে? একটু দরকার ছিল।"
“ বাড়িতে তো কিছু জানায়নি? কখন ফোন করেছিল?”
“রাতে। ঠিক আছে আমি ফোন করে জেনে নেব।"
“ভেতরে আসবে না?”
“না আজ আর যাব না। একটু তাড়া আছে।"
“আহেলির বন্ধু শুভ্রজিতের চেহারাটা রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে গেল। শরতের বিকেলটা দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। যাই যাই করেও কিছুটা রঙ এখনও লেগে আছে আকাশের গায়ে। সে দিকে অপলক চেয়ে থাকে অম্বালিকা। দিনান্তের এই রঙের ছোঁওয়াটুকু ধ’রে রাখতে চায় তার বিবর্ণ ক্যানভাসে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
ছবি: সংগৃহীত
0 Comments
Post Comment