শবনম

  • 12 February, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 68 view(s)
  • লিখেছেন : অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
তার পিছনে আরও কতগুলো লোক এসে দাঁড়িয়েছে। এসময় বইমেলা যাওয়ারই লোক বেশি। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ দেখলেই সে কথা মালুম হয়। শবনমের ঠিক পিছনের লোকগুলো অল্প দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়েছে। শবনম আর নাফিসার পরনের বোরখার উপর তারা চোখ বুলিয়ে নেয়। নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে। সামনে পিছনে সকলেরই আধুনিক পোশাক। কাঁধে ঝোলাব্যাগ অনেকের। চোখে চশমা। মেয়েদের পরনে শাড়ি, অথবা সালোয়ার স্যুট। সকলেরই চোখে উদাস দৃষ্টি। বইমেলার ‘মানুষ’ যেমন হয়।

শবনম দেখে। মানুষের লাইনটা কেমন লম্বা হয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ছড়িয়েছে। বইমেলার সময়। তাই এমন ভরদুপুরেও এই রুটে ভিড়ের কমতি নেই। শবনম মেয়ের হাত ধরে টানতে টানতে সারির শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়ায়। এরই মধ্যে আরও কয়েকজন এসে পড়েছে। লাইন বাড়তে থাকে।

 

বইমেলার সময় কিনা অন্য কোথাও! শবনমের নিজেরও যে সেকথা মনে হয়নি তা নয়। তবু মেয়েটা তার ধুলোর এ্যালার্জিতে ভোগে। ছুটির দিনে তাকে বইমেলা নিয়ে যেতে তাই ভরসা হয় না তার। একদিন সে নিজেই সময় বের করে চলে যাবে বরং। কিনে আনবে পছন্দের কিছু বই। মেয়েটা খুশি হয়ে যাবে। আড়ালে-আবডালে নাফিসাকে বই দিতে হবে। একসঙ্গে দু’জনে বইমেলা না যাওয়ার এও এক কারণ। দু’জনে একসঙ্গে গেলে, বাড়ি ফিরলেই ঝোলা উজাড় করে সুলেমানকে সবকিছু দেখাতে হবে। আর অমনি সে বাছতে বসবে মেয়েকে কোন বইটা দেওয়া যায়, আর কোনটা দেওয়া যায় না একেবারেই। কড়া মুসল্লি সুলেমানের দাপটে বই জিনিসটাই যে মেয়ের হাতে কখনও-সখনও পৌঁছতে পায়, এও এক বিস্ময়। অবশ্য তার পিছনে সুলেমানের উদারতার চেয়ে শবনমের কূটনীতিরই অবদান বেশি।

 

সুলেমান চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করেছিল, “কোথায় নিয়ে যাচ্ছো বললে?” শবনম কেটে কেটে আবারও জবাব দেয়, “বললাম তো। সায়ান্স সিটি নিয়ে যাচ্ছি। স্কুল থেকে পাশ দিয়েছে। রোপওয়ে চড়িয়ে আনব।” “হুমম,” গলা দিয়ে শব্দ করে সুলেমান। বড়বাজারে তার কাপড়ের দোকান। বাড়িতে সেলাই চালিয়ে শবনম দোকানের কাজ সামাল দেয়। মজুরি নয়, কেবল নিকে করা বউ হওয়ার সুবাদে এটুকু ফ্রি সার্ভিস, আর তার বিনিময়ে দুবেলা খাবার। মেয়ে নাফিসাকে যে স্কুলে যেতে দিচ্ছে এখনও অবধি, এই ঢের। অবশ্য প্রাইমারি ক্লাস ফুরুলে তারপর অবস্থা কী দাঁড়াবে, সে আশঙ্কা এখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। নতুন করে আর বাচ্চা দিতে পারেনা শবনম। সেই নিয়েও হয়তো সুলেমানের রাগ। অথচ সুলেমান বাইরে তা প্রকাশ করে না। অদ্ভুৎ শীতলতায় কতগুলো অদৃশ্য স্টিলের রড যেন শবনমকে তার চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে। তার বাইরে বেরনো চলে না। আবার কোনো দিন বেরলেও, নির্দিষ্ট সময়ের ভিতর মাথা নীচু করে তাকে আবারও খাঁচায় ফিরে আসতে হয়।

 

তার পিছনে আরও কতগুলো লোক এসে দাঁড়িয়েছে। এসময় বইমেলা যাওয়ারই লোক বেশি। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ দেখলেই সে কথা মালুম হয়। শবনমের ঠিক পিছনের লোকগুলো অল্প দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়েছে। শবনম আর নাফিসার পরনের বোরখার উপর তারা চোখ বুলিয়ে নেয়। নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে। সামনে পিছনে সকলেরই আধুনিক পোশাক। কাঁধে ঝোলাব্যাগ অনেকের। চোখে চশমা। মেয়েদের পরনে শাড়ি, অথবা সালোয়ার স্যুট। সকলেরই চোখে উদাস দৃষ্টি। বইমেলার ‘মানুষ’ যেমন হয়। এর মাঝে শবনম, নাফিসার পোশাক বেমানান লাগছে খুব। বাকিদের চাউনিতেই সেকথা পরিষ্কার।

 

শবনমের মনে পড়ে মেয়েকে নিয়ে বোট্যানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়ার দিন। বাগানে ঘোরার সময় নিজে থেকেই বোরখা খুলে ফেলেছিল ওরা। মা-মেয়ে, দুইজনেই। আবার ফেরার সময় লঞ্চঘাটে দাঁড়িয়ে তাদের বোরখা চাপিয়ে নেওয়া। তাকিয়ে তাকিয়ে আশেপাশের মানুষেরা তাদের জরিপ করছিল। শবনম কিছু বলতে পারেনি। কানে এসেছিল বলছে কেউ, “এতটুকু বাচ্চাকেও, দেখেছ!” শবনম প্রতিবাদ করে না। শবনম জানে একার বিপ্লবে ফুলকির সৃষ্টি হয়। ওদের সমাজে মেয়েদের অধিকার সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন জোরালো আগুন। যে আগুনে অনেকের অংশগ্রহণ থাকবে। তাই তার আগে সলতে পাকানোর কাজেও স্বভাবতই অনেকটা সময় লাগবে। তা সেই সলতে পাকানোর কাজটুকুই, শবনমেরাও কি এতদিনে শুরু করতে পেরেছে? হয়তো পেরেছে। হয়তো পারেনি। তবু শবনম লুকিয়ে-চুরিয়ে মেয়েকে অন্যধাঁচের বই কিনে দেয়। সুলেমানকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নাফিসাকে নিয়ে যায় সায়ান্স সিটি অথবা তারামণ্ডলে। শবনম জানে, মনের অন্ধকারটুকু ক্রমশ ক্রমশ কাটিয়ে তুলতে পারলেই, বাইরের ঘেরাটোপের জোব্বাগুলো খুলে ফেলতে আর বেশী সময় লাগবে না। কেবল মনের জানলাটুকু উজাড় করে খুলে ফেলাটাই আজ, সর্বাগ্রে দরকার বলে মনে হয় তার।

 

“আমরা বইমেলা যাব না?” আশেপাশের ভিড় দেখে নাফিসা শবনমকে জিজ্ঞেস করে। “আজ নয় সোনা, আরেকদিন,” শবনম জবাব দেয়। মেয়ে আবারও চারপাশ দেখে জিজ্ঞেস করে, “এরা সবাই বইমেলা যাচ্ছে মা?” শবনম তার শরীরটা মেয়ের দিকে ঝুঁকিয়ে ঘাড় নাড়ে, “হ্যাঁ রে মা,” কিন্তু আর কিছু বলার আগেই সে আবারও সোজা হয়ে দাঁড়ায়। কানে আসে পিছন থেকে কেউ আরেকজনকে বলছে, “সত্যি কীভাবে যে এরা ব্রিড করে আর বেড়ে ওঠে। তাও তো এই মালটার সঙ্গে এই একটাই মেয়ে দেখছি।” “বাকিদের বাড়িতে রেখে এসেছে দ্যাখ,” জবাব দেয় কেউ। আরও সামনে কেউ এসআইআর নিয়ে আলোচনা করে।

 

“ওদিক থেকে যত আপদ এদিকে এসে জুটেছে। আর একের পর এক মাদ্রাসা খুলে বসেছে। এখন এভাবে এসআইআর করা ছাড়া আর উপায় কী! মানছি আমাদেরও ভোগান্তি হচ্ছে!” শবনম কান দেয় না। গত কয়েক বছরে এমন মন্তব্য-পালটামন্তব্যের কূজন তাদের চারপাশে ক্রমশ আরোই বেড়ে উঠতে পেরেছে। তা, সেসব মেনে নিতে নিতেই এগিয়েছে শবনম। আর কতদিন? কতদিক থেকেই বা এমন অজস্র বাধাবিপত্তি, অবস্ট্রাকশনকে সহ্য করে নিয়ে নাফিসাকে বড় করে তুলতে হবে শবনম জানে না। তবু সে চেষ্টা করে। চেষ্টা করতে চায়। ছোটবেলায় সে স্কুলে পড়েছিল ‘ডেভিড কপারফিল্ড’। তবু, অনেক পড়লেও কি সত্যকার মানুষ হওয়া যায়? আশেপাশের ভিড় অথবা মানুষের অবস্থা দেখে মাঝে মাঝে তার নিজেকেও প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়। বাস আসছে। লাইনের মধ্যে একটা অস্বস্তি দেখা যায়।

 

ভদ্দরলোক। ফিসফিস করে শবনম নিজেকে বোঝাতে যায়। এঁরা সক্কলে লেখাপড়া জানা, মানীগুণী মানুষ। হয়তো এঁদেরও কোথাও-কোথাও অল্পস্বল্প ভুল হয়ে যায়। নিশ্চিত ভাবে এঁরা সকলেই হয়তো মন থেকে এইরকম নন। মনে মনে নিজের ভাবনাগুলোকে আবারও কড়া ধমক দেয় শবনম। ঠিকই তো, এই এত বড় লাইনে সামান্য কয়েকটা মন্তব্যেই মাত্র, এমন সাধারণ ধারণা করার কোনো কারণ ঘটেনি। বাসটা টার্মিনাসে ঢুকে পড়েছে প্রায়। ঠিক তখনই ব্যাপারটা ঘটল।

 

সারি বেঁধে চলতে থাকা পিঁপড়েদের উপর যদি চটাস করে হঠাৎ চটির ঘা দেওয়া হয় কোথাও, পিঁপড়েগুলো যেমন ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক-সেদিক উচ্ছৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, শবনমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোও ঠিক তেমনই সবকিছু ভুলে গিয়ে যেন ছড়িয়ে পড়ল। কোনোদিকে তাকাল না কেউ। সারিবদ্ধতায় দাঁড়িয়ে রইল কেবল নাফিসা, শবনম আর মেরেকেটে আরও দু’পাঁচজন। ভদ্রতার মুখোশগুলো গড়িয়ে পড়ে হঠাৎ যেন কুৎসিত বিশৃঙ্খলতায় সেই সব বইমেলাগামী মানুষেরাও আদিযুগের গ্ল্যাডিয়েটরী কায়দায়, বাসটিকে পাকড়াও করতে অগ্রসর হলেন। গালাগালি, গুঁতোগুঁতি আর চিৎকারের মাঝে সেই সব ভদ্দরলোকেরাই হঠাৎ যেন কোনোদিকে না তাকিয়ে একযোগে, পরস্পরের সঙ্গে হামলায় জড়ালেন। সারিতে তখনও দাঁড়িয়ে থাকা দু’পাঁচজনের মৃদু প্রতিবাদ কারও কানে গেল না বিশেষ।

 

বাসে উঠে স্বভাবতই সেই দাঁড়িয়ে থাকা দু’পাঁচজনের কোনো আসন জুটল না। অবাক, সরল চোখে শবনম দেখল, এবং কানেও শুনল, অম্লানবদনে লাইন-ভেঙে ছুটে যাওয়া মানুষেরা কেমন একই সঙ্গে অন্ধ এবং কালা হয়ে বসে আছেন। বাসজুড়ে প্রতিবন্ধী সিট। শবনম ঘাড় ঝাঁকায়। দাঁড়ানোর জন্য স্টিলের রড আর নিজের মাঝখানে নাফিসাকে দাঁড় করিয়ে দু’জনের ভারসাম্য নিশ্চিত করে। বাস ছেড়ে দিয়েছে। কণ্ডাকটর দেঁতো হাসিতে পিছনে তখনও চলতে থাকা ভদ্দরলোক-সুলভ কূটকচালিকে উপভোগ করে। দাঁত দিয়ে পানমশলার প্যাকেট হাসিল করে মুখে ঢেলে দেয়।

 

সায়ান্স সিটি স্টপেজে শবনমকে নামতেও যথেষ্ট কসরত করতে হল। ভিড় ঠেলে, মেয়েকে বাঁচিয়ে সে কোনোমতে নীচে নেমে এল। বাসটা গজরাতে গজরাতে আবারও ছুটে চলে গেল অবলীলায়। শবনম মেয়ের দিকে তাকায়। “লাগেনি তো মা?” মেয়ে দুপাশে ঘাড় নাড়ে, “না মা!” সে খিলখিল করে হাসে অল্প। শবনম জিজ্ঞেস করে, “হাসছিস যে?” মেয়ে আরও হেসে বলে, “জানো তো মা, নামবার সময় খালি খালি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দাদুটা আমার পিঠে কিলবিলি দিয়ে দিচ্ছিল! উপর থেকে সেই নীচ অবধি। হিহি!” নাফিসা আবারও হেসে ওঠে। শবনম বাধা দিতে গিয়েও দিতে পারে না। কী বলা উচিত মাথায় আসে না তার।

 

“আচ্ছা বেশ বেশ, চল তো এখন,” সে মেয়ের হাত ধরে এগোয়। মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, এর চেয়েও তো কত খারাপ কিছু ঘটতে পারত!

লেখক : বিজ্ঞানী, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক 

[চিত্রঋণঃ গুগল জেমিনি এআই]

0 Comments

Post Comment